মঙ্গলবারের (২৩ জুন) পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, সংসদ সদস্যদের জন্য নিজ নিজ এলাকার রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো উন্নয়নে ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ রাখা হবে। প্রতিবছর ১০ কোটি টাকা করে পাঁচ বছর এই টাকা দিয়ে সংসদ সদস্যরা নিজেদের পছন্দমতো অবকাঠামো উন্নয়ন করতে পারবেন। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন (বিভাগওয়ারি) নামের প্রকল্প তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।
সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষ বরাদ্দের ইতিহাস
একবার কোনো কিছু চালু হলে সেটি যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে থাকে। এটি ভালো নাকি মন্দ, এ নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ হয় না। সংসদ সদস্যদের এ ধরনের বরাদ্দ দেওয়া শুরু হয় ২০০৫-০৬ অর্থবছরে। ওই সময় ক্ষমতায় ছিল বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার। জামায়াতে ইসলামী ছিল বিএনপির প্রধান অংশীজন। সংসদে তাদের সম্মিলিত সংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশের বেশি।
২০০৬ সালের শেষ দিকে চারদলীয় সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। তারপর আসে পলিটিক্যাল সুনামি—এক-এগারো। তার ধাক্কা সামলে জাতীয় সংসদ আবার উঠে দাঁড়ায়। এবার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসে চৌদ্দ দলের সরকার। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জুটে যায় জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, বিজেপি (মঞ্জু), তরীকত ফেডারেশন ইত্যাকার দল। সংসদে তাঁদের সংখ্যা তিন-চতুর্থাংশের চেয়ে বেশি। তাঁরা আগের সরকারের তরিকা বহাল রাখেন। সংসদ সদস্যদের জন্য রাখা হয় বিশেষ বরাদ্দ। এটা ‘থোক বরাদ্দ’ নামে পরিচিতি পায়।
জমিদারি প্রথার পুনরাবৃত্তি
একই সঙ্গে নিয়ম করা হয়, সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে থাকবেন। ১৭৯৩ সালে ইংরেজ গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিশ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে যে জমিদারি প্রথা চালু করেছিলেন, সেটি নতুন মোড়কে চলে আসে। ৩০০ জন সংসদ সদস্য জমিদারি কায়দায় পেয়ে যান পাঁচসালা বন্দোবস্ত।
এক সংসদের মেয়াদ শেষ হলে আরেক সংসদ আসে। নিয়মটি বহাল থাকে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর একই প্রকল্প নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তখন আসনপ্রতি বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ২৫ কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ায় প্রকল্পটি আর পাস হয়নি। এবার বরাদ্দ হয়েছে দ্বিগুণ।
বরাদ্দের অপব্যবহার ও দুর্নীতি
আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি, ভবন ও কালভার্ট তৈরিতে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে। কালভার্ট বানানো হয়েছে কারও বাড়ির ভিটায় বা ধানখেতে, যেখানে কোনো সড়ক নেই। অনেক কালভার্ট বা সেতু অসমাপ্ত রেখে বিল নিয়ে ঠিকাদার হাওয়া হয়ে গেছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে যেসব প্রকল্প নেওয়া ও বাস্তবায়ন হয়েছে, তার একটি স্বাধীন মূল্যায়ন হওয়া দরকার ছিল। সেটি হয়নি।
অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকেন সরকারি দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। দলকে খুশি রাখা তাঁর দায় ও দায়িত্ব। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে দরকার হবে গুচ্ছের ঠিকাদার। তাঁরা কে এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা ও সংসদ সদস্যের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কী, এ নিয়ে সামাজিক-নৃতাত্ত্বিক গবেষণা হলে একটি আন্তসম্পর্কের সূত্র ও পরম্পরা বেরিয়ে আসবে।
স্থানীয় সরকারের দুর্বলতা
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশে স্থানীয় সরকার দাঁড়াতে পারল না। কারণ, সবকিছুই কেন্দ্রীভূত। একবার ক্ষমতা হাতে পেলে সেটি কেউ ছাড়তে চান না। স্থানীয় সরকারকে ক্রমান্বয়ে সরকারি প্রশাসন যন্ত্রের মুখাপেক্ষী করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় সরকার নিয়ে একটি কমিশন করেছিল। সেটি ‘মারা’ গেছে।
মহিউদ্দিন আহমদ, লেখক ও গবেষক, এই মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, "আমরা কথায় কথায় জনগণের ক্ষমতায়ন নিয়ে বাগাড়ম্বর করি। আমাদের কর্তারা নানান ছুতোয় বিদেশে যান। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা বা প্রাচ্যের জাপান এত উন্নত কেন? কারণ, তাদের আছে শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা।"
ভবিষ্যৎ পরিণতি
অন্তর্বর্তী সরকারের একটি প্রস্তাব ছিল, সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হোক। আমাদের মূলধারার বড় দলগুলো তাতে সম্মত হয়নি। কারণটা বোধগম্য। নিজের লোককে জিতিয়ে আনতে হলে ওপর থেকে কলকাঠি নাড়তে হয়। ভবিষ্যতে যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে, সেখানে আমরা হয়তো দেখব, সংসদ সদস্যরা তাঁদের প্রভাব খাটিয়ে বশংবদদের জিতিয়ে নিয়ে এসেছেন এবং তাঁদের ক্ষমতার হাত আরও লম্বা করেছেন।



