মোবাইলের অ্যালার্মে ধরা পড়ল চার খুনের রহস্য, গ্রেপ্তার প্রতিবেশী
মোবাইলের অ্যালার্মে ধরা পড়ল চার খুনের রহস্য

গাজীপুরের শ্রীপুরের একটি দোতলা বাড়িতে ২০২০ সালের ২৪ এপ্রিল ভোরে এক ইন্দোনেশীয় নারী ও তার তিন সন্তানের রক্তাক্ত লাশ পাওয়া যায়। নারীটি বৈবাহিক সূত্রে ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন, আর তার বাংলাদেশি স্বামী তখন মালয়েশিয়ায় ছিলেন। তিন সন্তানের মধ্যে দুজন কিশোরী কন্যা ও একজন বাক্প্রতিবন্ধী ছেলে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও তদন্তের শুরু

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র্যাব), পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদস্যরা। প্রাথমিকভাবে তদন্তকারীরা কোনো ক্লু খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তবে একটি মুঠোফোনের বেজে ওঠা অ্যালার্মই সন্দেহভাজন খুনিকে ধরিয়ে দেয়। পিবিআইয়ের নথি থেকে এসব তথ্য জানা যায়।

পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীপুরের এক ব্যক্তি ১৯৯০-এর দশকে মালয়েশিয়ায় যান। সেখানে তাঁর সঙ্গে ইন্দোনেশীয় ওই নারীর পরিচয় হয়। ২০০১ সালে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়। ২০০৭ সালে পরিবারটি বাংলাদেশে এসে বসবাস শুরু করে। ২০১৫ সালে স্ত্রী–সন্তান রেখে ওই ব্যক্তি আবার মালয়েশিয়ায় চলে যান। ২০২০ সালে তাঁর স্ত্রী–সন্তানেরা খুন হওয়ার সময় তিনি প্রবাসেই ছিলেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

খটকা ও সন্দেহভাজন শনাক্তকরণ

ঘটনার দুদিন পর ২০২০ সালের ২৬ এপ্রিল এই হত্যা মামলার তদন্তভার পায় পিবিআই। শুরুতে তদন্তকারীরা ঘটনাটিকে ডাকাতি–সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করছিলেন, কারণ ঘর থেকে স্বর্ণালঙ্কার, নগদ অর্থ ও মুঠোফোন খোয়া গিয়েছিল। তবে একটি খটকা ছিল—সাধারণ ডাকাতির ঘটনা হলে চারজনকে এত নৃশংসভাবে খুন করা হবে কেন?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই খটকা থেকে পিবিআইয়ের তদন্তকারীরা সন্দেহ করছিলেন, ভুক্তভোগীদের পরিচিত এক বা একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সন্দেহভাজন হিসেবে পারভেজ মিয়া (২০) নামের এক প্রতিবেশীকে শনাক্ত করে পিবিআই। নিহতদের স্বজনেরা জানান, কয়েক মাস আগে পারভেজ বাড়িটিতে চুরি করতে ঢুকেছিলেন। ধরা পড়ার পর তিনি ক্ষমা চেয়ে চলে যান। মুঠোফোনের প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল।

নাটকীয় মোড়: মোবাইলের অ্যালার্ম

পিবিআই জানায়, ২৬ এপ্রিলই তাঁরা পারভেজকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। সেদিন গভীর রাতে তাঁর বাড়িতে গিয়ে তল্লাশি শুরু করেন তদন্তকারীরা। তবে তিনি কিছুতেই সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করছিলেন না। তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ করতে করতে ফজর নামাজের সময় হয়ে আসে। হঠাৎ তদন্তকারীদের কানে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি। শুরুতে তাঁরা ভেবেছিলেন, আশপাশের কোনো মসজিদ থেকে আসছে। কিছুক্ষণ পরে মনে হয়, ঘরের ভেতর থেকেই আজানের ধ্বনি আসছে। উৎস খুঁজতে গিয়ে ঘরে একটি গর্তের সন্ধান পান তদন্তকারীরা। মাটি সরাতেই পাওয়া যায় একটি মুঠোফোন। সেই মুঠোফোন থেকেই আজানের ধ্বনি আসছিল।

পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা বলেন, মুঠোফোনটি নিহত ইন্দোনেশীয় নারীর। ফজরের ওয়াক্তে তাঁর মুঠোফোনে অ্যালার্ম হিসেবে আজানের ধ্বনি দেওয়া ছিল। আর সেটাই তদন্তকারীদের সামনে বেজে উঠেছিল। এ ঘটনায় পারভেজকে আরও ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তিনি চারজনকে খুনের কথা স্বীকার করেন।

তদন্তের অন্যান্য প্রমাণ ও স্বীকারোক্তি

পিবিআই জানায়, প্রথমে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্তকারীদের ধারণা হয়, মূল দরজা দিয়ে নয়, বরং বাথরুমের ভেন্টিলেটর দিয়ে খুনি ঘরে ঢুকেছিল। বাথরুমের আশপাশ ও বাড়ির পেছনের দেয়ালে খুনির পায়ের ছাপও পাওয়া যায়। তদন্তকারীরা পারভেজের পায়ের ছাপ সংগ্রহ করেন এবং ঘটনাস্থলে পাওয়া পায়ের ছাপের সঙ্গে মিলিয়ে সাদৃশ্য পান। তবে তখনো হাতে এমন কোনো আলামত ছিল না, যার ভিত্তিতে সরাসরি জড়িত বলা যায়।

পারভেজ পরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ২৩ এপ্রিল দিবাগত রাত পৌনে একটার কিছু আগে তিনি চুরি করতে বাড়িটিতে ঢোকেন। বাথরুমের খোলা ভেন্টিলেটর দিয়ে তিনি ঘরের ভেতর ঢুকেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল গৃহকত্রীর কক্ষে গিয়ে মুঠোফোনসহ মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করা। তবে দরজা খোলার সময় শব্দ হয়। নারী জেগে যান। তখন তিনি নারীর দুই মেয়ের কক্ষে গিয়ে আলনার আড়ালে লুকিয়ে পড়েন। ওই নারী তাঁর মেয়েদের কক্ষে আসেন। পারভেজকে দেখে চিনে ফেলেন। ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় পারভেজ তাঁর সঙ্গে থাকা বটি দিয়ে ওই নারীর ওপর হামলা চালান। এতে বাকিরা জেগে যায়। পরে চারজনকেই কুপিয়ে জখম করেন তিনি। প্রায় ৫ ঘণ্টা তিনি বাড়িটিতে ছিলেন। এই সময়ে তিনি একজনকে ধর্ষণ করেন। দুজনকে ধর্ষণচেষ্টা করেন।

পিবিআই বলছে, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়, পারভেজ ভুক্তভোগীদের অন্তত একজনকে খুনের আগে ধর্ষণ করেছিলেন। পারভেজের বাড়ি থেকে নিহতদের ব্যবহৃত মুঠোফোন, স্বর্ণালঙ্কার, ডায়েরিসহ আরও কিছু মালামাল উদ্ধার করা হয়। নগদ ৩০ হাজার টাকা ও একটি স্বর্ণের আংটি উদ্ধার করা হয় পারভেজের বাবার কাছ থেকে। এ ছাড়া কানের দুল পাওয়া যায় পারভেজের বোন ও ভগ্নিপতির কাছে।

মামলার বর্তমান অবস্থা

এ ঘটনায় পারভেজ, তাঁর বাবা কাজিম উদ্দিন, বোন কামরুন্নাহার ও ভগ্নিপতি আবুল কালাম আজাদকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পিবিআই। মামলাটি এখনো বিচারাধীন।

পিবিআইয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল বলেন, “পায়ের ছাপ, আগের চুরির ঘটনা, উদ্ধার হওয়া লুটের মালামাল, ফরেনসিক–ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল, আসামির স্বীকারোক্তি—সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত তদন্তে চার খুনের রহস্য উদঘাটিত হয়। তবে তদন্তের সবচেয়ে নাটকীয় মোড় ছিল মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা সেই মুঠোফোনের অ্যালার্ম।”