লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার তিন দিন পার হলেও হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। অভিযুক্ত হত্যাকারীর মাদকাসক্তি, তাঁর সঙ্গে নিহত ব্যক্তিদের পূর্বপরিচয়, স্বর্ণালংকার লুট, অর্থ লেনদেন ও পূর্ববিরোধ—এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য কারণ হিসেবে এগুলোই সামনে এসেছে। তবে কোনো একটি কারণের পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ পায়নি পুলিশ। ফলে এ নিয়ে চলছে নানান আলোচনা।
তদন্তের বর্তমান অবস্থা
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনাটির পেছনের কারণ অনুসন্ধানে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের বক্তব্যসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করছে পুলিশ। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, তদন্তে এখনো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। হত্যার সময় বাসার ভেতরে ঠিক কী ঘটেছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তির লক্ষ্য একজন ছিলেন নাকি পুরো পরিবার, হত্যার আগে কোনো বাগ্বিতণ্ডা হয়েছিল কি না কিংবা পূর্বপরিচয় থাকা সত্ত্বেও কেন এমন ভয়াবহ হামলা চালানো হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
স্থানীয় ও স্বজনদের প্রতিক্রিয়া
রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, “এই নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো রায়পুরবাসীকে শোকাহত ও আতঙ্কিত করেছে। মানুষ জানতে চায়, কী কারণে এমন ঘটনা ঘটল।” নিহত শাহিনুর বেগমের ছোট ভাই ছানা উল্লাহর দাবি, তাঁর বোনের কাছে কিছু স্বর্ণালংকার ছিল। সেগুলো লুট করার উদ্দেশ্যেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটতে পারে বলে তাঁদের সন্দেহ। তবে এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে বের করার দাবি জানান তিনি।
সংসদ সদস্যের বক্তব্য
গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর) আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া। তিনি বলেছেন, ‘সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যা হবে, আমরা তা মেনে নেব। এর সঙ্গে যদি অন্য কেউ জড়িত থাকে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এ ঘটনাকে পুঁজি করে কোনো ধরনের সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করা যাবে না।’
দাফন সম্পন্ন
খুন হওয়া মা ও তিন মেয়ের লাশ কুমিল্লার হোমনা উপজেলার লটিয়া গ্রামের সামাজিক কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবরে দাফন করা হয়েছে। গত শুক্রবার রাত ৯টা ৩১ মিনিটে লাশবাহী দুটি অ্যাম্বুলেন্সে করে মা ও তিন মেয়ের লাশ হোমনা উপজেলার লটিয়া গ্রামে পৌঁছায়। মা ও মেয়েদের লাশ একনজর দেখার জন্য লোকজন ভিড় করে। পরে লাশগুলো গ্রামের মেঘনা নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত সামাজিক কবরস্থানে নেওয়া হয়। সেখানে কবরস্থানের পাশের মাঠে মেঘনা নদীর তীরে রাত ১০টায় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে পাশাপাশি চারটি কবরে মা ও তিন মেয়ের লাশ দাফন করা হয়। রাত ১১টায় দাফনের কার্যক্রম শেষ হয়।
আতঙ্ক কাটেনি
ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও রায়পুরে আতঙ্ক কাটেনি। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড গতকাল শনিবারও ছিল আলোচনার বিষয়। চায়ের দোকান, বাজার, অলিগলি—সবখানেই ঘুরেফিরে আলোচনায় আসছে মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনা। রায়পুর শহরের এনায়েতপুর এলাকার বাসিন্দা ও শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। ঘরের ভেতরে মা ও তিন মেয়ের রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। সেই দৃশ্য এখনো তাঁর চোখে ভাসে। ঘটনার রাতে তিনি ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি।
ময়নাতদন্তের ফলাফল
লাশগুলোর ময়নাতদন্তের কাজে ছিলেন লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা (আরএমও) অরূপ রায়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। নিহত চারজনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্ত শেষে লাশগুলো পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মামলা ও অভিযুক্তের মৃত্যু
মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনায় রায়পুর থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। গত শুক্রবার নিহত শাহিনুর বেগমের ছেলে জুনায়েদ ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি করে। মামলায় অন্তর মজুমদার ছাড়াও অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার নদীর পাড়ের একটি ভাড়া বাসায় এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হন শাহিনুর বেগম (৪০) এবং তাঁর তিন মেয়ে সাইমা আক্তার (২১), ইকরা বেগম (১৭) ও সিপা (১০)। তাঁদের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলায়। দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটি রায়পুরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিল। ঘটনার পর পালানোর সময় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে স্থানীয় লোকজন আটক করে গণপিটুনি দেন। পরে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। অন্তরের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায়। তাঁর বাবার নাম কার্তিক মজুমদার।
পুলিশের বক্তব্য
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীন মিয়া বলেন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্বর্ণালংকার চুরি এবং আরও কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি মাদকাসক্ত ছিলেন বলেও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে হত্যার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব নয়।



