পশ্চিমবঙ্গ, তথা ভারতের গণতন্ত্রের জন্য একটি অভূতপূর্ব এবং সম্ভবত ভয়ংকর ঘটনা ঘটল আজ বৃহস্পতিবার। আদালতের একটি সিদ্ধান্তের কারণে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় আপাতত বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে বহাল রইলেন তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। অথচ এই পদটি পাওয়ার কথা ছিল তৃণমূল কংগ্রেস মনোনীত বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের। কারণ, বিজেপির পরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮০টি আসন পেয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস।
বিরোধী দলনেতা পদের আইনি জটিলতা
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া পার্টিরই বিরোধী দলের মর্যাদা পাওয়া যুক্তিযুক্ত, যদি তাদের আসনসংখ্যা মোট আসনের ১০ শতাংশ হয়। তৃণমূলের আসন ওই ১০ শতাংশের থেকে অনেক বেশি। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিরোধীদলীয় নেতার পদটি তৃণমূল কংগ্রেসকে দেওয়া হলো না। কলকাতা হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের কারণে তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় পেলেন বিরোধীদলীয় নেতার পদ।
আজ কলকাতা হাইকোর্ট এই পদে ঋতব্রতর নিয়োগের ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেননি। হাইকোর্টের বিচারপতি কৃষ্ণ রাও জানান, এই মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ২৮ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে। উভয় পক্ষকে— অর্থাৎ তৃণমূল কংগ্রেস ও দল থেকে বেরিয়ে যাওয়া বিধায়কদের এই মামলায় নিজ নিজ হলফনামা জমা দিতে হবে।
সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক পরে তৃণমূলের ভেতরের ফাটল প্রকাশ্যে আসে। দলের পক্ষ থেকে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে এই পদের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল। তবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ৮০ জনের মধ্যে ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন দাবি করে নিজেকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে নিয়োগের আবেদন জানান। দলবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত থাকার অভিযোগে তৃণমূল কংগ্রেস এরই মধ্যে ঋতব্রতকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে।
তৃণমূলের দাবি, তাদের দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা পদে নিয়োগ করার কথা স্পিকারকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু স্পিকার সেই নির্দেশ উপেক্ষা করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়োগ দেন।
আদালতে যুক্তিতর্ক
স্পিকারের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরেও কেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করা হলো এবং শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে নিয়োগের জন্য পাঠানো প্রথম চিঠিটি কেন বিবেচনায় নেওয়া হলো না, বিচারপতি এই প্রশ্ন করেন। জবাবে বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুর আইনজীবী জানান, বিরোধী দলনেতা কীভাবে নিযুক্ত হবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। এই সিদ্ধান্ত বিধানসভার অতীত দৃষ্টান্ত ও সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছে।
স্পিকার বসুর আইনজীবী উল্লেখ করেন, তৃণমূল থেকে নির্বাচিত ৫৮ জন বিধায়ক সরাসরি স্পিকারের কাছে গিয়ে ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতা হিসেবে নিয়োগের অনুরোধ করেছেন। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনি দলও যুক্তি দেয়, বিরোধী দলনেতা নির্বাচন সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে। তাঁরা দাবি করেন, যেহেতু দলত্যাগী বা বহিষ্কৃত বিধায়কদের বিরুদ্ধে কোনো দলত্যাগ বিরোধী আইন প্রযোজ্য হচ্ছে না, তাই তাঁদের এই সমর্থন সম্পূর্ণ আইনসম্মত হিসেবে গণ্য করা উচিত।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জোরালো সওয়াল করে বলেন, বিরোধী দলনেতা নির্ধারণের ক্ষমতা রাজনৈতিক দলের হাতেই রয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের হাতে নয়। তাই দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য করা উচিত এবং অন্য কোনো ব্যক্তিকে এই পদে নিয়োগ করা উচিত নয়।
বিচারপতি দুই পক্ষের বক্তব্য শোনেন। পরে ঋতব্রতকে বিরোধীদলীয় নেতার পদে নিয়োগ দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত স্পিকার রথীন্দ্র বসু নিয়েছিলেন, সেই সিদ্ধান্তই বিচারপতি বলবৎ রাখেন।
প্রতিক্রিয়া
আদালতের সিদ্ধান্তের পরে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থক, তথা অপর এক বহিষ্কৃত তৃণমূল বিধায়ক সন্দীপন সাহা প্রচারমাধ্যমে বলেন, ‘এটি আমাদের নৈতিক জয়। আমরা যা কিছু করেছি, সম্পূর্ণ আইনি পথেই করেছি।’



