প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং জোরদারের আহ্বান
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতিসংঘ পুলিশ প্রধানদের সম্মেলনে ভবিষ্যতের জটিল নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জ্ঞান-বিনিময় এবং প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলন ৭ ও ৮ জুলাই অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাঁচ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সম্মেলনের মূল সেশন ও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা ফয়সল হাসান জানান, এবারের সম্মেলনে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পুলিশ প্রধান, মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি এবং নীতিনির্ধারকরা বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছেন। সম্মেলনের তিনটি মূল প্লেনারি সেশন হলো— ‘জাতিসংঘ পুলিশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা’, ‘জাতিসংঘ পুলিশিংয়ে উদ্ভাবন ও নতুন প্রযুক্তি’ এবং ‘আন্তঃদেশীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি’।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষণ
বুধবার (৮ জুলাই) সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, “বর্তমান বিশ্বে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ক্রমেই বহুমাত্রিক ও জটিল হয়ে উঠছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ, সাইবার অপরাধ, সংগঠিত অপরাধী চক্র এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ নেটওয়ার্কের বিস্তারের ফলে প্রথাগত পুলিশিং ব্যবস্থাকে সময়োপযোগীভাবে রূপান্তর করা জরুরি হয়ে পড়েছে।”
বাংলাদেশকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারবদ্ধ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশের দৃঢ় প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় বাংলাদেশ তার ফর্মড পুলিশ ইউনিটকে আধুনিক, দক্ষ এবং অভিযোজনক্ষম হিসেবে গড়ে তুলছে।”
বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত সক্ষমতা
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ পুলিশে সোয়াট, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, সাইবার ও সংগঠিত অপরাধ তদন্ত, ফরেনসিক সক্ষমতা, ইমিগ্রেশন পুলিশ এবং ইন্টেলিজেন্স-লেড পুলিশিংয়ের মতো বিশেষায়িত সক্ষমতা ক্রমাগত শক্তিশালী করা হচ্ছে।” এসব সক্ষমতা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও কার্যকর অবদান রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
‘জাতিসংঘ পুলিশ জ্ঞান ও উদ্ভাবন নেটওয়ার্ক’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার পদ্ধতিগত বিনিময়ের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি ‘জাতিসংঘ পুলিশ জ্ঞান ও উদ্ভাবন নেটওয়ার্ক’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, “এই ধরনের একটি নেটওয়ার্ক সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সেরা অনুশীলন, উদ্ভাবনী পদ্ধতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে।”
জলবায়ু পরিবর্তন ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন এখন শুধু পরিবেশগত নয়, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতা, মানবিক নিরাপত্তা এবং সীমান্ত-অতিক্রমী নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলছে।” এই বাস্তবতায় তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং প্রস্তুতি বাড়ানোর লক্ষ্যে বার্ষিক পরিবেশ পুলিশিং সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব করেন।
ভবিষ্যতের পুলিশিং ও মানবিক মূল্যবোধ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘ পুলিশকে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও উদ্ভাবনী, অভিযোজনক্ষম এবং মানবিক মূল্যবোধনির্ভর বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, “শান্তি, নিরাপত্তা ও মানবতার স্বার্থে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা এবং সক্ষমতা বিনিময় আরও জোরদার করতে হবে।”
সম্মেলনে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিরা ছাড়াও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, অপারেশনাল সাপোর্ট এবং রাজনৈতিক ও শান্তি বিনির্মাণ বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলরা উপস্থিত ছিলেন।



