পোড়া মবিলের চুলার উৎপাদন, বাণিজ্যিক বিক্রি, অনলাইন প্রচার ও যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। একইসঙ্গে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে এসব চুলা নির্মূলে গৃহীত আইনগত, প্রশাসনিক ও কারিগরি পদক্ষেপের বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতের আদেশ ও রিটের প্রেক্ষাপট
বুধবার (১ জুলাই) বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায়ের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সুলতানা শেহেরজাদ নামে একজনের দায়ের করা রিট আবেদনের শুনানি শেষে এই আদেশ দেয়। রিটকারীর আইনজীবী নুসরাত জাহান সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধানের মৌলিক অধিকার, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশ রক্ষার্থে এই রিট দায়ের করা হয়। ব্যবহৃত মোটর অয়েল পোড়ানোর ফলে মারাত্মক বিষাক্ত দূষক নির্গত হয়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। আদালত শুনানি গ্রহণ করে পোড়া মবিল চুলার তৈরি, বাণিজ্যিক বিক্রি, অনলাইনে প্রচার ও যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, সে মর্মে রুল জারি করেন।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণ
রিট আবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালের ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবহৃত মোটর অয়েলকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা উন্মুক্ত বাতাসে পোড়ানো বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের লঙ্ঘন। প্রতিদিন ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা এই চুলার পাশে কাজ করায় রেস্তোরাঁর বাবুর্চি ও ভাসমান বিক্রেতারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। বিষাক্ত ধোঁয়া শ্বাসগ্রহণের ফলে শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ ও ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগের শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। চুলার অসম্পূর্ণ দহনে নির্গত কার্সিনোজেনিক ভারী ধাতব কণা সরাসরি খোলা খাবার ও রান্নার তেলে মিশে খাদ্যশৃঙ্খল দূষিত করছে।
এছাড়া দাহ্য এই তরল বর্জ্য ঘিঞ্জি এলাকা ও জনাকীর্ণ বাজারে ব্যবহারের ফলে যেকোনো সময় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি রয়েছে। বর্জ্য তেল নিষ্কাশনের ফলে মাটি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে জলাশয়ের ইকোসিস্টেম ধ্বংস হচ্ছে। দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় এটি ‘পাবলিক নুইসেন্স’ হওয়া সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে চুলার প্রসার ঘটানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়।
রিটের প্রার্থনা ও আদালতের নির্দেশনা
আবেদনে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বেশ কয়েকটি নির্দেশনা চাওয়া হয়। এর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জনসমাগমস্থল, খোলা খাবারের দোকান ও কারখানা থেকে এসব চুলা বাজেয়াপ্ত ও ধ্বংস করার আরজি জানানো হয়। ইউটিউব ও ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব চুলার প্রস্তুত প্রণালি সংক্রান্ত ভিডিও ও বিজ্ঞাপন বন্ধে বিটিআরসিকে তাৎক্ষণিক কারিগরি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ চাওয়া হয়। একইসঙ্গে ব্যবহৃত মোটর অয়েল পোড়ানোর স্বাস্থ্যঝুঁকি, অগ্নিকাণ্ডের শঙ্কা ও পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে দেশব্যাপী সংবাদমাধ্যমে জনসচেতনতামূলক প্রচার চালানোর নির্দেশনাও চাওয়া হয়।
রিট আবেদনে পরিবেশ, আইন, স্বাস্থ্য, স্বরাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ মোট ১১ জনকে বিবাদী করা হয়। আদালতে রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট নুসরাত জাহান। তাকে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট নিলুফা সুলতানা, অ্যাডভোকেট মীর সাজিদ রুবেল ও অ্যাডভোকেট মো. সাইফুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে বিবাদীদের প্রতিনিধিত্ব করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক। তাকে সহায়তা করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জামিলা আহমেদ ও জাশেদুল জনি।



