জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আট অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায় ঘোষণার পর এটিকে ‘প্রহসনের বিচার’ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
রায়ের বিবরণ
মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুর আড়াইটায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে তিন অভিযোগের প্রতিটিতে ১০ বছর করে মোট ৩০ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে ইনুকে। তবে সব সাজা একসঙ্গে চলবে বিধায় তাকে ১০ বছরের সাজা ভোগ করতে হবে।
ইনুর প্রতিক্রিয়া
রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণ থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় সাংবাদিকদের উদ্দেশে ইনু বলেন, ‘প্রহসনের বিচারের সাজা দিল, আমি বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেলাম।’ এ সময় প্রিজন ভ্যানে থাকা অন্য কয়েকজন আসামি ‘জয় বাংলা’ বলে স্লোগান দেন।
পরিবারের বক্তব্য
আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত ইনুর স্ত্রী আফরোজা হক রীনা সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইনুর বিরুদ্ধে দেওয়া এই রায় প্রত্যাখ্যান করি, ঘৃণা করি। আমরা সংক্ষুব্ধ। আমরা আইনজীবী, পরিবার ও দলের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’
প্রসিকিউশনের অবস্থান
রায় ঘোষণার পর চিফ প্রসিকিউটর তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষ এই রায়ে সন্তুষ্ট নয় এবং আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব। আপিলের মাধ্যমে আমরা ইনুকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া তিনটি অভিযোগের প্রত্যেকটিতে বর্ধিত শাস্তি চাইব এবং বাকি অভিযোগগুলো থেকে তার খালাসকে চ্যালেঞ্জ করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেসব অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে, সেগুলো প্রমাণের জন্য যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল যে সাজা এবং খালাসের রায় দিয়েছেন, সেটি আইনের যথাযথ ব্যাখ্যা অনুভব না করেই দিয়েছেন। ইনুর বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অভিযোগের ভিডিও এবং অডিও ডকুমেন্ট আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। ইনু সাফাই সাক্ষ্য দেওয়ার সময় সেসব অভিযোগ স্বীকারও করেছেন। তারপরও আদালত তাকে কীভাবে সাজা কম দেয় বা খালাস দেয় সেটি বোধগম্য নয়। তাই আমরা অবশ্যই এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাওয়া সাপেক্ষে আপিল বিভাগে আপিল করব।’
সাজার মেয়াদ নিয়ে বিতর্ক
তিনটি অভিযোগের প্রত্যেকটিতে দশ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এটিকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড বলা হবে নাকি ১০ বছরের কারাদণ্ড বলা হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘অবশ্যই এটিকে ৩০ বছরের কারাদণ্ডের সাজা বলতে হবে। অবশ্যই তিনি ৩০ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত। ট্রাইব্যুনাল যেহেতু সাজাটা কনকারেন্ট (সমসাময়িক) করে দিয়েছেন, তাই একসাথে ১০ বছর খাটবেন। তবে আমরা মনে করি, এই ৩০ বছর কনজিকিউটিভ (পরপর ভোগ করা) রায় হওয়া উচিত ছিল অ্যাটলিস্ট। ১০ বছর সাজা, এরকম বলার কিছু নেই।’
মামলার প্রক্রিয়া
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ ইনুর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন চিফ প্রসিকিউটরের কাছে জমা দেওয়া হয়। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে প্রসিকিউশন। একই দিন ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নিয়ে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২ নভেম্বর আটটি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলার বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।



