মেট্রোরেলের স্টেশনের নিচের ফুটপাত দখল করে বসেছে জামাকাপড় বিক্রির দোকান। মিরপুর ১০ নম্বরে, সোমবার বিকেলের এই চিত্র দেখা যায়। উত্তরা থেকে প্রতিদিন মেট্রোরেলে করে মিরপুরে কর্মস্থলে যাতায়াত করেন ফেরদৌসী শেফা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেখলেনই তো, হাঁটার উপায় নেই। পুরো ফুটপাত হকার আর ভ্রাম্যমাণ দোকানের দখলে। কিছু বলতে গেলেও উল্টো তারাই খেপে যায়। তাই এখন আর কিছু বলি না, চুপচাপ নিজের কাজে চলে যাই।’
ফুটপাতের বর্তমান অবস্থা
সোমবার বিকেলে মিরপুর-১০ নম্বর মেট্রোস্টেশনের নিচে গিয়ে দেখা যায়, দুই পাশের ফুটপাতের বেশির ভাগ জায়গাই বিভিন্ন ভ্রাম্যমাণ দোকানের দখলে। কোথাও চা-শিঙাড়া, কোথাও চটপটি, আবার কোথাও কাপড় ও নানা ধরনের পণ্য বিক্রি হচ্ছে। ফলে ফুটপাতে পাশাপাশি দুজন মানুষের হাঁটাও কঠিন হয়ে পড়েছে। একে অপরকে পাশ কাটাতে গিয়ে প্রায়ই ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটছে।
পথচারীরা জানান, এই অবস্থার মধ্য দিয়েই তাঁদের চলাচল করতে হয়। মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে।
দোকান বসানোর প্রক্রিয়া ও টাকা
মিরপুর-১০ নম্বর স্টেশনের নিচের ফুটপাতে দোকান বসাতে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয় বলে জানান একাধিক হকার। শুরুতে এ বিষয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। প্রতিবেদক দোকান বসাতে আগ্রহী হকার পরিচয়ে কথা বললে কয়েকজন হকার ‘আবুল’ নামের এক ব্যক্তির কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁরা জানান, নতুন দোকান বসানোর বিষয়টি তিনিই দেখভাল করেন।
আবুল নামের ওই ব্যক্তি সোমবার বিকেলে মেট্রোস্টেশনের নিচে নতুন আরেকটি ভ্রাম্যমাণ দোকান বসানোর কাজ করছিলেন। আবুলের সঙ্গে কথা হলে তিনি প্রথমে জানতে চান কী ধরনের দোকান দেওয়া হবে। চায়ের দোকানের কথা বলতেই তিনি বলেন, ‘চা দোকান দিলে ২০ হাজার টেকা লাগব।’ অন্য ধরনের দোকানের জন্য কত টাকা লাগবে জানতে চাইলে তাঁর জবাব, ‘অন্যডি বসাইলে ৩০ হাজার লাগব।’
টাকা কিছুটা কমানোর অনুরোধ করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘মাইনষে পজিশন পায় না, আপনে আইছেন কমাইতে। এক টেকাও কম হইব না।’ আবুল ফুটপাতের একটি নির্দিষ্ট জায়গা দেখিয়ে বলেন, সেখানে নতুন দোকান বসানো যাবে। তিনি জানান, অগ্রিম টাকার পাশাপাশি প্রতিদিন বিদ্যুৎ–সংযোগ ও নিরাপত্তার জন্য আরও ১৫০ টাকা দিতে হবে। দোকানের অবস্থান ও আকারভেদে এই অর্থ আরও বাড়বে। স্টেশনের সিঁড়ির ঠিক সামনে দোকান বসাতে চাইলে অগ্রিম ৪০ হাজার টাকা এবং প্রতিদিন ৩০০ টাকা দিতে হবে।
সিটি করপোরেশন বা মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ অভিযান চালালে কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে আবুল বলেন, অভিযান হলে আগের দিনই দোকানিদের সেটা জানিয়ে দেওয়া হয়। তাই তাঁদের কোনো সমস্যা হয় না।
ব্যস্ত স্টেশনগুলোতে একই চিত্র
শুধু মিরপুর-১০ নয়, মেট্রোরেলের কারওয়ান বাজার, শাহবাগ ও মতিঝিল স্টেশন ঘুরেও একই চিত্র দেখা গেছে। বর্তমানে ঢাকা মেট্রোরেল প্রতিদিন সাড়ে চার লাখের বেশি যাত্রী পরিবহন করছে। যাত্রীসংখ্যা বেশি হওয়ায় মেট্রোরেলের বিভিন্ন স্টেশনে সকাল-সন্ধ্যায় প্রচণ্ড ভিড় থাকে।
সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, মেট্রোরেলের মতিঝিল স্টেশনের নিচে ও আশপাশের ফুটপাতের বড় অংশজুড়ে হকার ও ভ্রাম্যমাণ দোকান বসেছে। কোথাও চা-সিগারেটের দোকান, কোথাও খাবারের স্টল, আবার কোথাও পোশাক ও বিভিন্ন পণ্যের অস্থায়ী দোকান। ফলে পথচারীদের জন্য হাঁটার জায়গা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে ব্যস্ত সময়ে স্টেশন থেকে বের হওয়া বা প্রবেশ করা যাত্রীদের এসব দোকানের ফাঁক গলে চলাচল করতে হয়।
পথচারী ও আশপাশের লোকজন জানান, এসব ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করেন রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা বিভিন্ন ব্যক্তি। তাঁদের অনুমতি ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেই বেশির ভাগ ভ্রাম্যমাণ দোকান বসানো হয়।
ডিএমটিসিএলের উচ্ছেদ অভিযান
মেট্রোরেল স্টেশনসংলগ্ন ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সংস্থাটি জানায়, সর্বশেষ গত ৩০ জুন কাজীপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে নির্বাহী পরিচালকের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে ভ্রাম্যমাণ দোকান ও অননুমোদিত স্থাপনা অপসারণ করা হয়। এর আগে ১৪ জুন কারওয়ান বাজার স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় এবং ২ জুন উত্তরা উত্তর ও উত্তরা সেন্টার স্টেশনের নিচেও একই ধরনের অভিযান পরিচালনা হয়।
এ বিষয়ে ডিএমটিসিএলের উপপ্রকল্প পরিচালক আহসান উল্লাহ শরিফী গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেসব ফুটপাতে ভ্রাম্যমাণ হকার বসে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে তাঁদের উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’
তবে পথচারী ও নিয়মিত যাত্রীরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন উচ্ছেদ অভিযানে স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। অভিযান শেষ হওয়ার পরেই হকাররা আবার আগের জায়গায় ফিরে আসেন। নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর তদারকির অভাবে ফুটপাত আবার দখল হয়ে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাহবাগ স্টেশনসংলগ্ন ফুটপাতের কয়েকজন হকার জানান, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ বা সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযান হওয়ার আগে অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা আগাম খবর পেয়ে যান। তখন দোকানপাট ও মালামাল সরিয়ে নিরাপদ স্থানে রেখে দেন। অভিযান শেষ হলে আবার আগের জায়গায় দোকান বসিয়ে ব্যবসা শুরু করেন।
ফলে উচ্ছেদ অভিযানের দাবি থাকলেও বাস্তবে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মেট্রোরেল স্টেশনগুলোর নিচের ফুটপাত এখনো হকার ও ভ্রাম্যমাণ দোকানের দখলেই রয়েছে। এর খেসারত দিতে হচ্ছে প্রতিদিন লাখো পথচারী ও মেট্রোরেলের যাত্রীদের।



