হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। গত এক মাসে উপজেলায় সংঘটিত হয়েছে পাঁচটি হত্যাকাণ্ড। পাশাপাশি চুরি, ডাকাতি ও মাদক বাণিজ্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটায় জনমনে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
হত্যাকাণ্ডের বিবরণ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১০ জুন উপজেলার কাশিরামপুর গ্রামের প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুল জলিলের ওপর নৃশংস হামলা চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি ২১ জুন মৃত্যুবরণ করেন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঘটনাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে দায়ের করতে থানায় গেলে প্রভাবশালী মহলের চাপে বাহুবল মডেল থানা পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে এবং শেষ পর্যন্ত মামলা গ্রহণ করেনি।
এরপর ১৫ জুন উপজেলার আদিত্যপুর এলাকায় সংঘটিত হয় জোড়া খুনের ঘটনা। এতে নিহত হন সেলু মিয়া ও হেলাল মিয়া। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ৪ আগস্ট উপজেলার খোজারগাঁও গ্রামে আব্দুল্লাহ নামের এক যুবককে হত্যা করা হয়। একই দিন মহাশয় বাজার এলাকায় রিম্পা নামের এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করা হয়, এ ঘটনায় নিহতের স্বামী ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ, যা এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
পুলিশের ভূমিকা ও জনমনে ক্ষোভ
একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হলেও এসব ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। এর পাশাপাশি হত্যা মামলাকে কেন্দ্র করে ‘মামলা বাণিজ্যের’ অভিযোগও উঠেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
চুরি, ডাকাতি ও মাদকের বিস্তার
শুধু হত্যাকাণ্ডই নয়, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনদুপুরে চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল-মিরপুর মহাসড়কে রাত হলেই ডাকাতির ঘটনা যেন নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে। এক মাসে তিনটি সড়ক ডাকাতির ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ, ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
এদিকে উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে মাদক বাণিজ্যের বিস্তার ঘটেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি ও সেবনের ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। ফলে বাহুবল ক্রমেই মাদকের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। ৬ জুন নিয়ন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার দুলাল মিয়া দুই ইয়াবাসেবনকারীকে হাতে নাতে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিলেও পরে পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়।
অবৈধ সিলিকা বালু উত্তোলন
এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে সিলিকা বালু উত্তোলনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের দাবি, এসব কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না পুলিশ। বরং গুঞ্জন রয়েছে, মাসোহারা গ্রহণের মাধ্যমে এসব কর্মকাণ্ডে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। এমনকি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার তথ্য আগাম ফাঁস করে দিয়ে বালু উত্তোলনকারীদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
রাজনৈতিক নেতার প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বাহুবল উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফেরদৌস আলম চৌধুরী তুষার বলেন, “ওসির নিষ্ক্রিয়তার কারণে উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। খুন, চুরি ও ডাকাতির ঘটনা বেড়েই চলেছে। দ্রুত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি করা না হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে না।”
এ ব্যাপারে বাহুবল মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলামের বক্তব্য জানতে মোবাইলে কল দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্রশাসনের অবস্থান
বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজ্জল রায় বলেন, “সামাজিক দাঙ্গা বেশি হওয়ার কারণে এরকম হতাহতের ঘটনা ঘটছে। আমরা শ্রীঘ্রই স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করে এসব ঘটনা কিভাবে এড়ানো যায় তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করব। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।”



