ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ রোধে রেজল্যুশন কাঠামো বাস্তবায়ন: অর্থমন্ত্রী
ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ রোধে রেজল্যুশন কাঠামো

ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ঋণ জালিয়াতি ও আর্থিক অনিয়ম রোধে সরকার একটি সুসংগঠিত রেজল্যুশন কাঠামো বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে। একইসঙ্গে এসব ব্যাংকের অনিয়ম তদন্তে বিশেষ ফরেনসিক অডিট চলছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ীদের নিয়োগ বাতিলসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য

রবিবার (১২ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর পর্বে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলামের লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ তথ্য জানান।

প্রশ্নে সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী সরকারের আমলে সীমাহীন লুটপাট, বেনামী ঋণ জালিয়াতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-সহ কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ও বেসরকারি ব্যাংকে নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারের পদক্ষেপ কী— তা জানতে চান তিনি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সুসংগঠিত রেজল্যুশন কাঠামো প্রতিষ্ঠা

জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি সুসংগঠিত ও বহুমাত্রিক রেজল্যুশন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে। এর আইনি ভিত্তি হিসেবে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি জানান, এ আইনের আওতায় সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংক— এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ (এক্সিম ব্যাংক) পিএলসি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এবং ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি—একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে। এটি রেজল্যুশন কৌশলের আওতায় সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ

অর্থমন্ত্রী বলেন, একীভূতকরণের ফলে পাঁচটি ব্যাংকের সব আমানতকারীর দাবি ও স্বার্থ নতুন ব্যাংকে সংরক্ষিত হয়েছে। পাশাপাশি ‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’-এর মাধ্যমে সুরক্ষিত আমানতের সর্বোচ্চ সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে রেজল্যুশনের আওতায় অবসায়নাধীন ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের রেজল্যুশন স্কিম অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে তাদের অর্থ ফেরত পাচ্ছেন। আগে আমানত সুরক্ষা আইনের আওতায় না থাকা ফাইন্যান্স কোম্পানির আমানতকারীদেরও এখন এই সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে।

ফরেনসিক অডিট ও আইনি ব্যবস্থা

তিনি আরও জানান, একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের বিনিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়মে দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বিশেষ ফরেনসিক অডিট চলছে। ওই অডিট প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ী ব্যক্তিদের নিয়োগ বাতিলসহ অন্যান্য উপযুক্ত প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক মূলত আমানতকারীদের অর্থে পরিচালিত হয় এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা পরিচালনা পর্ষদের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ঋণ ও বিনিয়োগ সুবিধা গ্রহণ এবং ব্যাংক ও আমানতকারীদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এতে আমানতকারীদের আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয় এবং পুরো ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা দেখা দেয়।

পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন

এ পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের শেষ দিকে ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত)-এর ৪৭(১) ও ৪৮(১) ধারার ক্ষমতাবলে ১১টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে আইনের ৪৫ ধারার আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক মনোনীত পরিচালক ও স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়।

অর্থমন্ত্রী আরও জানান, পরবর্তীতে ২০২৫ সালের মার্চ, আগস্ট ও ডিসেম্বর মাসে আরও পাঁচটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।