উগ্রবাদী কার্যক্রমে অভিযুক্ত ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’: যা জানা যাচ্ছে
উগ্রবাদী কার্যক্রমে অভিযুক্ত ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’

ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে ছয় তরুণকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ (এফসিএস) নামের একটি সংগঠনের সদস্য, যা মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের আড়ালে উগ্রবাদী কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে অভিযুক্ত। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, স্থানীয়ভাবে উপকরণ সংগ্রহ করে তারা বোমা তৈরির চেষ্টা করছিল।

গ্রেফতার ও রিমান্ড

গত ৫ জুলাই ভোরে যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়া এলাকার একটি মাঠে প্রশিক্ষণ শুরুর সময় তাদের গ্রেফতার করা হয়। যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের পরিদর্শক এবি সিদ্দিক বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য ছিল যে, তারা ওইদিন ভোরে বালুর মাঠে প্রশিক্ষণ শুরু করছে। খবর পেয়ে আমরা সেখানে পৌঁছালে তারা পালানোর চেষ্টা করলেও আমরা ধরে ফেলি।’ গ্রেফতারদের মধ্যে রয়েছেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান প্রশিক্ষক শাহ আমানত সাবির (২৩) এবং তার সহযোগী হোসাইন তানিম। বুধবার দ্বিতীয় দফায় সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত সাবির ও তানিমকে তিনদিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেয়। বাকি চারজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, যাদের মধ্যে আতাউল্লাহ শাহ নামে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেতাও রয়েছেন। গ্রেফতারের পর এনসিপি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংগঠনের যাত্রা ও কার্যক্রম

ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেমের যাত্রা শুরু হয় চলতি বছরের জানুয়ারিতে খুলনা থেকে। প্রতিষ্ঠাতা শাহ আমানত সাবির খুলনার ময়লাপোতা এলাকার ফরাজীপাড়ার লেনে সংগঠনের ঠিকানা উল্লেখ করেছেন। ফেসবুক, ইউটিউব ও টেলিগ্রামে সক্রিয় সংগঠনটি ‘বিশ্বের প্রথম শিরকমুক্ত, কুফরমুক্ত, মিউজিকমুক্ত এবং পরিপূর্ণ শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী মার্শাল আর্ট’ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয়। ফেসবুক পেজে তারা লেখে, ‘আমাদের লক্ষ্য কেবল একজন দক্ষ প্রশিক্ষণার্থী তৈরি করা নয়; বরং এমন আত্মবিশ্বাসী, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দায়িত্বশীল মুসলিম গড়ে তোলা, যিনি প্রয়োজনে শরিয়াহর নির্দেশনা মেনে নিজের, পরিবারের এবং নিরপরাধ মানুষের আত্মরক্ষা করতে সক্ষম।’ গত ২০ জুন ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ভিডিওতে তারা বলে, ‘এটা শুধু শারীরিক প্রশিক্ষণ নয়। এটা আত্মরক্ষা, শৃঙ্খলা, মানসিক দৃঢ়তা এবং ঈমানি শক্তি দৃঢ় করার একটি প্ল্যাটফর্ম।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পুলিশের অভিযোগ

পুলিশ বলছে, মার্শাল আর্টের আড়ালে সংগঠনটি উগ্রবাদী কার্যক্রম পরিচালনার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের উগ্রপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে এফসিএসের যোগাযোগ রয়েছে এবং টাকার বিনিময়ে তাদের পক্ষে সদস্য সংগ্রহ ও অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সিটিটিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের আড়ালে তারা মূলত সাধারণ তরুণদের উগ্রবাদী মতাদর্শের পক্ষে আনার প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল ধীরে ধীরে সংগঠিত হওয়া এবং শক্তি সঞ্চয় করা।’ জিজ্ঞাসাবাদে সাবির ‘পটকার বারুদ’ দিয়ে হাত বোমা এবং পেট্রোল দিয়ে ‘পেট্রোল বোমা’ বানানোর চেষ্টার কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশ দাবি করে। একটি ভিডিওতে বোমা বিস্ফোরণের চেষ্টাও দেখা গেছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

প্রশিক্ষকের পরিচয়

শাহ আমানত সাবির ২৩ বছর বয়সী, খুলনার বাসিন্দা। ফেসবুক ভিডিওতে তিনি জানান, আট বছর আগে মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ শেষ করে ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ন্যাশনাল স্কুল অব ব্যুত্থান মার্শাল আর্টের খুলনা শাখায় প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সঙ্গীতকে হারাম মনে করে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর জানুয়ারিতে ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বলেন, ‘এটি এমন একটি মার্শাল আর্ট স্টাইল যেখানে হারাম মিউজিক ব্যবহার হয় না। মার্শাল আর্টের মাথা ঝুকিয়ে সম্মান করার রীতি এখানে বাদ দেওয়া হয়েছে, যেহেতু একজন মুসলিম শুধুমাত্র আল্লাহ-তায়ালার সামনেই মাথা ঝোকাবে।’ গত মে মাসে তিনি মুসলিম নারীদের জন্যও প্রশিক্ষণ শুরুর ঘোষণা দেন।

প্রতিক্রিয়া ও তদন্ত

গ্রেফতারের আগে সাবির ফেসবুক ভিডিওতে উগ্রপন্থার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, দেশি-বিদেশি কোনো উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই এবং প্রশিক্ষণের ভর্তি ফি দিয়েই কার্যক্রম চালান। তবে পুলিশ জানায়, তার মুক্তি চেয়ে ফেসবুকে থানা ঘেরাওয়ের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সিটিটিসি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এসব হুমকিতে ভীত নই। বরং যারা এসব হুমকি-ধামকি দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেব।’ আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানান তিনি। তদন্ত শেষ হলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। গ্রেফতারের পর যশোর ও খুলনার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে।