শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, পরীক্ষায় নকল ও প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে সরকার আরও কঠোর অবস্থান নেবে। তিনি বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের এমন কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এ ধরনের অপকর্ম করার সাহস না করে।’
মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। আসন্ন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা উপলক্ষে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, বরিশাল; বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন বরিশাল অঞ্চলের কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, পরীক্ষার সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নকল ও প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রতিরোধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করবে। কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নকলমুক্ত পরীক্ষা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন
এ সময় শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ‘পরীক্ষায় নকল নামক জিনিসটি বাংলাদেশে আর নেই, এটা শেষ হয়ে গেছে। এখন শিক্ষার মান উন্নয়নে কী কী করা প্রয়োজন, সেটি আমরা করছি।’ শিক্ষার মানোন্নয়নের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক বলেন, ‘সরকার শুধু পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করাই নয়, সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করছে। শিক্ষকদের কী কী সুবিধা-অসুবিধা রয়েছে, কোন কোন কারণে শিক্ষার মান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, সেসব বিষয় চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।’
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, নকলমুক্ত পরীক্ষা নিশ্চিত হওয়ার পর এখন শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। শিক্ষাব্যবস্থার বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে সমাধান করা হবে। শিক্ষকদের পেশাগত পরিবেশ উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা ও নির্দেশনা
সভায় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। পরীক্ষাকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা রক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং পরীক্ষার্থীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন মন্ত্রী।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন, বিভাগীয় কমিশনার খলিলুল আহমেদ, জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমান, পুলিশের বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান, বরিশাল-২ আসনের সংসদ সদস্য এস এম সরফুদ্দিন সন্টু, বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক এবং বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ইউনুস আলী সিদ্দিকী।
প্রধান শিক্ষক নিয়োগে মামলাজট
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, ‘মামলা–জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত ছিল। তবে এ বিষয়ে মহামান্য আদালত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছেন। এ জন্য ৩২ হাজার ৫০০ প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে মামলার কারণে আটকে ছিল। আগামী ২ জুলাই মামলাটির শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। মহামান্য আদালত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন, যাতে আমরা শিক্ষাব্যবস্থায় আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারি।’
প্রধান শিক্ষকের সংকটের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ২০১৭ সাল থেকে মামলাজটের কারণে ৩২ হাজার ৫০০ প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। দেশের প্রায় ৬৫ হাজার ৫০০ বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় অর্ধেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। এর মধ্যে অনেক শিক্ষক অবসরে গেছেন, কিন্তু নতুন নিয়োগ না হওয়ায় শূন্য পদগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
পরীক্ষার খাতা পুনর্মূল্যায়ন প্রসঙ্গে
পরীক্ষার খাতা পুনর্মূল্যায়ন প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আগে শুধু নম্বর যোগে কোনো ভুল হয়েছে কি না, সেটি যাচাই করা হতো। কিন্তু আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে এখন মূল্যায়নপ্রক্রিয়াকে আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। পরীক্ষক খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেছেন কি না, কোনো প্রশ্নের নম্বর কম দেওয়া হয়েছে কি না, এসব বিষয়ও পুনর্মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে।’
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন
মতবিনিময় সভা শেষে শিক্ষামন্ত্রী বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছালে উপাচার্য মো. মামুন অর রশিদ তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। পরে প্রশাসনিক ভবনের নিচতলায় দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন মন্ত্রী। এ সময় শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যা, অবকাঠামোগত সংকট, ক্যাম্পাস সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন দাবিদাওয়ার কথা তুলে ধরেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে এহছানুল হক মিলন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন ও ভালোবাসেন। সে কারণে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিদাওয়া বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তন বৃদ্ধির দাবির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘এখানকার জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, সরকার চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অতিরিক্ত জমি দেওয়া সম্ভব। আর যদি প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া না যায়, তাহলে অন্যত্র দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।’
উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘ইতিমধ্যে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ অনুমোদিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমরা নতুন আইনগত কাঠামো প্রণয়ন করছি। ইউরোপ ও আমেরিকার আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থার আদলে সেই কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এর সুফল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও পাবে।’



