রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় চিকিৎসক ডা. নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দায়ের করা মামলাটি তদন্তের জন্য ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টকে (সিআইডি) নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকার একটি আদালত। মঙ্গলবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালত এই নির্দেশ দেন এবং তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করেন।
মামলার বিবরণ
মামলাটি দায়ের করেন নিহতের আত্মীয় মো. মাশিউর রহমান শাহ। আদালতে অভিযোগ দাখিলের পর বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে আদালত সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেন। মামলায় অভিযুক্তরা হলেন ধীপ্রার স্বামী ডা. রহমত রশিদ, তার শ্বশুর ও বীরডেম হাসপাতালের কার্ডিয়াক বিভাগের প্রধান ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রশিদ, শাশুড়ি সিদ্দিকা সুলতানা এবং ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম ‘এয়ারকি’-র সম্পাদক সিমু নাসের।
অভিযোগের সারাংশ
বাদীপক্ষের আইনজীবী ফরহাদ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, ধীপ্রা ও রহমত একসঙ্গে পড়াশোনা করে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং পরে বিয়ে করেন। তাদের একটি দুই বছর বয়সী ছেলে রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তুলনামূলকভাবে কম সচ্ছল পরিবার থেকে আসা ধীপ্রা বিয়ের পর অভিযুক্তদের দ্বারা দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। এই নির্যাতনের ফলে তিনি গুরুতর বিষণ্ণতায় ভুগতে থাকেন এবং সন্তান জন্ম দেওয়ার পর প্রসবোত্তর বিষণ্ণতা, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা নিজেরা চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও ধীপ্রার চিকিৎসার খরচ বহন করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তার চিকিৎসা প্রয়োজনকে ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করেন। পাশাপাশি তারা এফসিপিএস পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও বাধা দেন।
মৃত্যুর আগের ঘটনা
মৃত্যুর কিছুদিন আগে ধীপ্রা ‘ফিমেল ডক্টরস ইন বাংলাদেশ’ ফেসবুক গ্রুপে একটি পোস্ট শেয়ার করেছিলেন, যেখানে তিনি অভিযুক্তদের দ্বারা নির্যাতনের বিবরণ দিয়েছিলেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২ জুন থেকে টানা তিন দিন ধীপ্রাকে একটি তালাবদ্ধ কক্ষে আটকে রাখা হয়। এই সময় তাকে খাবার দেওয়া হয়নি এবং তার দুই বছরের সন্তানকে দেখতে দেওয়া হয়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, ৪ জুন পরিস্থিতি জানতে পেরে ধীপ্রার মা ধানমন্ডির বাসাতি গ্রিন আবাসিক এলাকার ৪/এ নম্বর রোডের ৪৩ নম্বর ফ্ল্যাটে যান। মেয়েকে তালাবদ্ধ দেখে তিনি ঘর খুলতে অনুরোধ করলে ধীপ্রার স্বামী দরজা খুলে দেন। মুক্তি পাওয়ার পর ধীপ্রা তার মাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘মা, আমি ভাত খেতে চাই।’ এর কিছুক্ষণ পরই তিনি মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।
মৃত্যু ও পরবর্তী ঘটনা
অভিযোগে বলা হয়েছে, ধীপ্রা লুটিয়ে পড়ার পর অভিযুক্তরা তাকে হাসপাতালে নিতে দেরি করেন। তাৎক্ষণিক চিকিৎসার পরিবর্তে তারা ধীপ্রার শ্বশুর ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রশিদের প্রভাব ব্যবহার করে তাকে দূরের বীরডেম হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করেন, যেখানে পথিমধ্যেই তার মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর পর অভিযুক্তরা ময়নাতদন্ত না করিয়েই মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করেন এবং দ্রুত তাকে দাফন করে ঘটনা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় দাবি করা হয়েছে, ধীপ্রার মৃত্যু স্বাভাবিক নয় বরং পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, এবং পরবর্তী পদক্ষেপগুলো প্রমাণ ধ্বংস ও অপরাধ ঢাকার জন্য নেওয়া হয়েছে।
আদালতের নির্দেশে সিআইডি এখন তদন্ত শুরু করবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।



