দেশের সেবাখাতে দুর্নীতি ও ঘুষের চিত্র উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত ঘুষের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি।
জরিপের ফলাফল প্রকাশ
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত ‘সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ নামক সংবাদ সম্মেলনে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। জরিপে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে জাতীয়ভাবে দুর্নীতির শিকার হওয়া খানার হার বেড়েছে ১৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং ঘুষের শিকার হওয়া খানার হার বেড়েছে ২৫ দশমিক ২ শতাংশ।
ঘুষের পরিমাণ ও বাজেটের অনুপাত
একই সময়ে জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত মোট ঘুষের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। এই অর্থ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১ দশমিক ৫৮ শতাংশের সমান।
সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত খাত
টিআইবির তথ্যমতে, সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি ও ঘুষের মুখোমুখি হয়েছেন পাসপোর্ট এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সেবাগ্রহীতারা। আগের জরিপেও একই দুটি খাত শীর্ষে ছিল। যদিও খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে, তবুও বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা, ব্যাংকিং এবং ভূমি খাতে গড় ঘুষের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।
আইন-শৃঙ্খলা ও বিচার খাতে দুর্নীতি
প্রতিবেদনে বলা হয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারসংশ্লিষ্ট খাতে দুর্নীতি এবং ঘুষের উচ্চ হার এখনও বহাল রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষি, স্থানীয় সরকার, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পাসপোর্ট ও বিআরটিএর মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতেও দুর্নীতির প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে অথবা আগের অবস্থায় রয়ে গেছে।
গ্রাম-শহর বৈষম্য
জরিপে গ্রাম ও শহরের মধ্যে ঘুষের অভিজ্ঞতায়ও বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। গ্রামাঞ্চলের ৬৬ শতাংশ খানা ঘুষের শিকার হয়েছে, যেখানে শহরে এ হার ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে ঘুষের পরিমাণের ক্ষেত্রে শহুরে সেবাগ্রহীতাদের বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। শহরে গড়ে ৫ হাজার ৭৫৭ টাকা এবং গ্রামে ৪ হাজার ৮৬৪ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।
নিম্ন আয়ের পরিবার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব
টিআইবি বলছে, নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের বার্ষিক আয়ের তুলনায় বেশি অংশ ঘুষ হিসেবে দিতে বাধ্য হচ্ছে। পাশাপাশি নারী, আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও ঘুষের প্রভাব আরও গভীর, যা তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহায়তা এবং শিক্ষা খাতে নারী সেবাগ্রহীতাদের উল্লেখযোগ্য হারে দুর্নীতির শিকার হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে এসব খাতে নারীদের অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
ডিজিটাল সেবা ও দুর্নীতি
জরিপে আরও দেখা গেছে, বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল সেবা চালু হলেও তা দুর্নীতি কমাতে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে এখনও দালালনির্ভরতা ও ঘুষের ঝুঁকি বহাল রয়েছে। ডিজিটাল ও ম্যানুয়াল ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে সেবাগ্রহীতাদের অতিরিক্ত ভোগান্তিও পোহাতে হচ্ছে।
দুর্নীতির কারণ ও ঘুষের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ
দুর্নীতির কারণ সম্পর্কে উত্তরদাতাদের অধিকাংশই বিচারহীনতা, জনসচেতনতার অভাব এবং দুর্নীতিগ্রস্তদের পুরস্কৃত করার সংস্কৃতিকে দায়ী করেছেন। ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ খানা জানিয়েছে, ঘুষ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া সম্ভব নয়। টিআইবির ভাষায়, এটি ঘুষ আদায়ের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
অভিযোগ দায়ের ও প্রতিকার
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রায় অর্ধেক খানা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি সম্পর্কেই জানে না। যদিও ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ খানা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্পর্কে এবং মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা (জিআরএস) সম্পর্কে অবগত, তবুও অভিযোগ দায়েরের হার অত্যন্ত কম। অভিযোগ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পাওয়া যায় না বলে জানিয়েছে টিআইবি। এক-পঞ্চমাংশের বেশি ঘটনায় অভিযোগ গ্রহণই করা হয়নি এবং ৫১ শতাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।



