সম্প্রতিক হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অপুষ্টি ও মায়ের দুধ কম পাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত কারণ। সরেজমিনে ঢাকার দুটি হাসপাতালে গিয়ে জানা গেছে, যে সব মায়ের বাল্যবিবাহ হয়েছে তাদের সন্তানদের মধ্যে এসব উপসর্গ বেশি দেখা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাল্যবিবাহ শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যকে বড় ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে, যার ফলে হামে আক্রান্ত অনেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে এই বিষয়ে কোনো গবেষণা নেই।
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য
এমন বাস্তবতায় আজ ১১ জুলাই ‘তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি’ প্রতিপাদ্যে পালিত হচ্ছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস।
হামের ঝুঁকি ও প্রতিরোধ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা হাম রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। যেসব শিশু টিকা নেয়নি বা টিকা নেওয়ার পরও পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠেনি, তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপুষ্টি ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হামের জটিলতা বাড়িয়ে দেয়।
গুরুতর হাম ও বাল্যবিবাহের সম্পর্ক
সম্প্রতি বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিত্সাধীন কয়েক জন শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গুরুতর হাম আক্রান্ত শিশুদের উল্লেখযোগ্য অংশের মায়েরা অল্প বয়সে বিয়ে ও মাতৃত্বের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। গত মে মাসে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি হাম আক্রান্ত শিশুদের কয়েক জনের মায়ের বয়স ছিল ১৪ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘অপুষ্ট শিশু হামে আক্রান্ত হলে দ্রুত জটিলতা তৈরি হতে পারে। এক্ষেত্রে শিশুকে উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘এ’ দিতে হবে। পাশাপাশি মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত করাও জরুরি, যাতে বুকের দুধের মাধ্যমে শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়।’
ঢাকা কমিউনিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. নাহিদ সুলতানা বলেন, ‘আমাদের কাছে আসা গর্ভবতী কিশোরীদের একটি বড় অংশ ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে গর্ভধারণ করছে। এদের কম ওজনের ও অপুষ্ট শিশুর জন্ম হয়। এই শিশুরা যে কোনো সংক্রমণে সহজেই আক্রান্ত হতে পারে।’
বাল্যবিবাহের পরিসংখ্যান
বাল্যবিবাহ নিয়ে ২০২৪-এর মার্চে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২০ সালে ১৮ বছর বয়সের আগে বিয়ের হার ছিল ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ। ১৫ বছর বয়সের আগে বিয়ের হার ২০২৩ সালে ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ, যা ২০২০ সালে ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এছাড়া ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি মেয়েদের সন্তান জন্মদানের হার ৭৩ শতাংশ।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের বক্তব্য
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভোগে, যাদের ওজন কম এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তারাই হামে বেশি জটিলতার শিকার হয়। বিষয়টি নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন।’
নবজাতক মৃত্যু ও অপুষ্টি
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) এবং জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) স্বাস্থ্য ও জনমিতিক জরিপ অনুযায়ী দেশে প্রতি বছর ১ লাখ ২০ হাজার নবজাতক মারা যাচ্ছে। এর মধ্যে শতকরা ৭৫ শতাংশই কিশোরী মায়ের শিশু। জরিপে বলা হয়েছে, গত এক দশকে দেশে মাতৃমৃত্যু এবং সামগ্রিক শিশুমৃত্যুর হার কমলেও নবজাতক শিশুমৃত্যুর হার মোটেও কমেনি, বরং বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী অপুষ্টিজনিত কারণে দেশে প্রতিদিন ৬০০ শিশুর মৃত্যু ঘটছে, যার প্রায় ৭০ শতাংশই কিশোরী মায়ের শিশু।
জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞের মন্তব্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মাইনুল ইসলাম খান বলেন, ‘বাংলাদেশে এখনো দুই জন মেয়ের এক জন ১৬ বছরের আগেই বিয়ে করে এবং চার জনের এক জন ১৮ বছরের আগেই মা হয়।’



