চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ধার্যকৃত পৌরকরের বিরুদ্ধে আপিলের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র চিফ পারসনাল অফিসার নাসির উদ্দিন জানান, সিটি করপোরেশন কর্তৃক ধার্যকৃত ২৬৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকার পৌরকরের বিপরীতে গত সোমবার সিটি করপোরেশনকে প্রায় ১৯৮ কোটি টাকার চেক প্রদান করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের আইন অনুযায়ী ধার্যকৃত পৌরকরের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে শতকরা ৭৫ ভাগ টাকা জমা প্রদান করতে হয়। সেই প্রেক্ষিতে প্রায় ১৯৮ কোটি ২৬ লাখ টাকার চেক প্রদান করা হয়।
পূর্ববর্তী কর প্রদানের ইতিহাস
গত কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সিটি করপোরেশনকে পৌরকর বাবদ ৪৫ কোটি টাকা দিয়ে আসছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও বন্দর কর্তৃপক্ষ পৌরকর বাবদ ৪৫ কোটি টাকা প্রদান করেছে। কিন্তু সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এক পত্রে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিকট প্রায় ২৬৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা দাবি করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে এই কর প্রদানের জন্য বলা হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে বলা হয়, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের আলোকে গত অর্থবছরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে ১০০ কোটি টাকা প্রদান করা হয়, যা পরবর্তীকালে সমন্বয় করতে বলা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, সে হিসেবে বন্দর সিটি করপোরেশন থেকে ৫৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে।
সার্ভে ও কর নির্ধারণ
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিগত সব মেয়র দায়িত্ব পালনকালে বন্দর থেকে পৌরকর পাওনা নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে ৬/৭ কোটি টাকা থেকে শুরু করে গত অর্থবছর পর্যন্ত তা ৪৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। বর্তমান সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও বন্দর কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকা সার্ভে সম্পন্ন হয়। পুরো বন্দর এলাকা সার্ভের পর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পৌরকর নির্ধারণ করে। সিটি করপোরেশন বন্দরের স্থাপনা, জায়গা এবং এর আয়ের ওপর ভিত্তি করে বন্দরের ওপর ২৬৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ধার্য করে। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ সিটি করপোরেশনের আপিল বোর্ডের নিকট আপত্তি জানায়। বন্দর কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, তারা আপিল বোর্ডে জানিয়েছেন কর আরোপের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ভুল রয়েছে। তাদের মতে, এসেসমেন্টের ক্ষেত্রে একমত হলেও করপোরেশন কর্তৃক এককভাবে পৌরকর নির্ধারণের ব্যাপারে তারা একমত নয়। আপিল বোর্ডে বন্দরের পক্ষ থেকে পুনঃএসেসমেন্ট করার দাবি করা হয়।
সিটি করপোরেশনের বক্তব্য
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল আমীন জানান, বন্দর কর্তৃপক্ষ এসেসমেন্টে একমত হয়েছেন। তাছাড়া কর নির্ধারণ করবে সিটি করপোরেশন। এর পরও আপিল বোর্ডে তাদের নিকট ধার্যকৃত কর কমানোর ব্যাপারেও মতামত চাওয়া হয়েছে। কিন্তু কর কমানোর কথা না বলে পুনঃএসেসমেন্টের কথা তারা বলেছেন, যা কখনো সম্ভব নয়।
বন্দরের দাবি
বন্দরের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বরের গ্যাজেট অনুযায়ী বন্দরের বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত ভাড়া বাবদ আয় ৮৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। উক্ত আয়ের প্রেক্ষিতে বন্দর কর্তৃক প্রদেয় পৌরকর হওয়ার কথা ১৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। কিন্তু বন্দর সিটি করপোরেশনকে ৪৫ কোটি টাকা প্রদান করছে। বন্দরের মতে, করপোরেশন তার শতকরা ১৭ ভাগ পৌরকরের মধ্যে ৭ ভাগ হোল্ডিং ট্যাক্স, ৭ ভাগ পরিচ্ছন্নতা বাবদ এবং ৩ ভাগ লাইটিংয়ের জন্য নিয়ে থাকে। কিন্তু বন্দর এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও লাইটিংয়ের কাজ বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অর্থায়নে করে থাকে। এর পরও বন্দর কর্তৃপক্ষ ১৭ ভাগ পৌরকর দিয়ে থাকে। তাছাড়া, বন্দর কর্তৃপক্ষ ভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রে বন্দরের গ্যাজেট রেটের বাইরে যেতে পারে না। তাই করপোরেশন কর্তৃক পৌরকর ধরার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ত্রুটি রয়েছে বলে বন্দরের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান।
সিটি করপোরেশনের পাল্টা যুক্তি
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরও বলেন, বন্দরের ময়লাগুলো কারা নিয়ে ডাম্পিং করে। সিটি করপোরেশনের সড়ক দিয়ে বন্দরের ভারী যানবাহন চলায় বিপুল অর্থে তা মেরামত করতে হয়। সব বিবেচনায় তাদের বক্তব্যগুলো যৌক্তিক নয়।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ধার্যকৃত পৌরকরের বিরুদ্ধে বন্দর কর্তৃপক্ষ বিভাগীয় কমিশনার এবং পরবর্তী সময় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের বোর্ড সভায় এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা যায়।



