জাতীয় দুই নৃগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ভাতার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সরকার গঠনের পরই দেশের অতি ক্ষুদ্র দুই নৃগোষ্ঠী ওঁরাও ও মাহাতো জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন
সমতল ও পাহাড়ে বসবাস করা সকলের অধিকার সমুন্নত রাখার পাশাপাশি তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষা করা হবে—এমন প্রতিশ্রুতি নির্বাচনের আগেই ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিএনপির সেই বিশেষ উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভাতা প্রদানের প্রক্রিয়া
এই দুই জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ভাতা প্রদানের বিষয়টি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে বাস্তবায়ন করা হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
গত মে মাসে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনে ওঁরাও ও মাহাতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ভাতা প্রদানের বিষয়টি তুলে ধরেন সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক। প্রস্তাবে তিনি বলেন, ‘উল্লেখিত দুই জনগোষ্ঠী সিরাজগঞ্জ জেলায় বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ে অবস্থান করছে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। দারিদ্র্যসীমা হতে উত্তরণ না ঘটলে এই জনগোষ্ঠী বংশানুক্রমিকভাবে সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা যেমন-শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন পরিকল্পনা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ইত্যাদি হতে বঞ্চিত থেকে যাবে।’ জেলা প্রশাসকের এমন প্রস্তাব আমলে নিয়েছে সরকার।
মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে বাস্তবায়নের জন্য ৬টি প্রস্তাব বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, ইপিজেড ও অর্থনৈতিক জোন স্থাপন বিষয়ক। অন্যটি ওঁরাও ও মাহাতো জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করার। ইতোমধ্যে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে করণীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে। কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়মিতভাবে মন্ত্রিপরিষদে প্রতিবেদন আকারে পাঠাতেও বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো চিঠিতে এসব উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া ১ হাজার ৭২৯টি প্রস্তাবের মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিক বৈঠকের পর বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাবগুলো সরকারপ্রধানসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে উপস্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়-সংশ্লিষ্ট ৬টি সিদ্ধান্ত স্বল্প (এক বছর), মধ্য (তিন বছর) এবং দীর্ঘ (পাঁচ বছর) মেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জেলা ও মাঠ প্রশাসন অধিশাখার যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান বলেন, প্রতিবছরই ডিসি সম্মেলনে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রস্তাব আসে। গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এবারও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে এবং এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
জনসংখ্যার পরিসংখ্যান
২০২২ সালের সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী বাংলাদেশে ওঁরাও জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৮৫,৮৪৬ জন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে ওরাওঁ জনগোষ্ঠীর হার ৫.২০ শতাংশ। ঐতিহাসিকভাবে তারা প্রধানত রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলের বরেন্দ্র ভূমিতে বসবাস করে। আর ২০২২ সালের সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাহাতো জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৯ হাজার ২৭১ জন। বিবিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের মোট জনসংখ্যার মধ্যে তারা ১৯,২৭১ জন। দেশে বসবাসরত মোট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনসংখ্যার প্রায় ১.১৭ শতাংশ।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য
সরকার গঠনের আগে গত আগস্টে ময়মনসিংহে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জাতীয় প্রতিনিধি সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘সব জাতিগোষ্ঠীকে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক নিরাপদ দেশ গড়তে চায় বিএনপি।’ প্রত্যেকটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে একেকটি ‘রঙ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশকে আমরা বলেছি রেইনবো ন্যাশন বৈচিত্রের মধ্যেই ঐক্য প্রতিষ্ঠা রাখা আমাদের মূল লক্ষ্য। সকল জাতিগোষ্ঠী মিলেমিশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে বিএনপি বদ্ধপরিকর।’
সমতল ও পাহাড়ে বসবাস করা সকলের অধিকার সমুন্নত রাখার পাশাপাশি ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষায় বিএনপির বিশেষ উদ্যোগ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় সংসদ ও দলীয় কমিটিতে যোগ্য প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তি, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ট্রাইব্যুনাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনকে ট্রাস্ট হিসেবে মর্যাদা প্রদান, দেশি-বিদেশি প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, নারী উদ্যোক্তাকে সহজে ঋণ প্রদান বাস্তবায়নে বিএনপির পরিকল্পনা রয়েছে’। পাহাড়ি অঞ্চল কিংবা সমতলে বসবাসকারী প্রত্যেকটি জনগোষ্ঠী নিজ দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সচেতন থাকলে কোনো অপশক্তি বিভ্রান্তি ছড়ানোর সুযোগ নিতে পারবে না বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।



