পাবনার বেড়ায় তিন লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে মিজানুর রহমান (৪০) নামে এক ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে তুলে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক মারধর ও হাত-পা ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় শ্রমিক দল নেতা রিপন সরদার ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। গত মঙ্গলবার দুপুরে বেড়া সিঅ্যান্ডবি এলাকা থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর এই নির্যাতন চালানো হয় এবং ওই রাতেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় আজ বুধবার বেড়া থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
আহত ব্যবসায়ী ও অভিযুক্তদের পরিচয়
আহত ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বেড়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মনজেল খানের ছেলে। তিনি এলাকায় হোটেল ও গাড়ির ব্যবসা পরিচালনা করেন। অন্যদিকে, অভিযুক্ত মূল হোতা রিপন সরদার (৩৫) সাঁথিয়া উপজেলার করমজা সরদারপাড়া গ্রামের পাশা সরদারের ছেলে এবং তিনি সাঁথিয়া উপজেলা শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।
ঘটনার বিবরণ
মামলা ও স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বেড়া পৌরসভার সিঅ্যান্ডবি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান ও তার ভাই গোলাম মোস্তফা মিলে একটি মার্কেট নির্মাণ করছেন। গত ১৯ জুন শ্রমিক দল নেতা রিপন তার দলবল নিয়ে ওই নির্মাণাধীন মার্কেটে গিয়ে দুই ভাইয়ের কাছে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে দাবিকৃত টাকা না দিলে তাদের প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীরা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রিপন সরদার তার সহযোগীদের নিয়ে মোটরসাইকেলযোগে এসে মিজানুর রহমানকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যান। পরে তাকে পার্শ্ববর্তী সাঁথিয়া উপজেলার করমজা বাজার বণিক সমিতির সভাপতি মহরম সরদারের কার্যালয়ে আটকে রাখা হয়।
নির্যাতনের বিবরণ
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, করমজা বাজারের ওই অফিসে আটকে রেখে মিজানুর রহমানের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। লোহার রড ও পাইপ দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি আঘাত করায় তার একটি হাত ও একটি পা ভেঙে গেছে। ঘটনার পর তাকে রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে রাতে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
মামলা ও পুলিশের পদক্ষেপ
এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে আহত ব্যবসায়ীর ভাই গোলাম মোস্তফা বাদী হয়ে রিপনসহ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বেড়া থানায় একটি লিখিত মামলা দায়ের করেছেন। মিজানুরের পরিবারের সদস্যরা আরও জানান, এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই অভিযুক্ত রিপন সরদার ও করমজা বাজার বণিক সমিতির সভাপতি মহরমসহ একটি চক্র তাদের পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেছিল। সে সময় নিরুপায় হয়ে তারা সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নিলে সেনা সদস্যরা অভিযুক্তদের ডেকে এনে একটি মুচলেকা সই করিয়ে নেন। ওই মুচলেকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, ভবিষ্যতে এই ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তার সমস্ত দায়ভার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বহন করতে হবে। এরপর দীর্ঘদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও সম্প্রতি ওই চক্রটি আবারও পুরোনো রূপে ফিরে এসে নতুন করে চাঁদা দাবি শুরু করে।
অভিযুক্তের বক্তব্য
তবে চাঁদাবাজি ও মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে সাঁথিয়া উপজেলা শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক রিপন সরদার জানান, এর আগে তারা তাকে সেনাবাহিনীর কাছে নিয়ে গিয়ে অভিযোগ করেছিলেন, তবে সেনাবাহিনী সেই অভিযোগের কোনো সত্যতা খুঁজে পায়নি। পাল্টা অভিযোগ এনে তিনি বলেন, ওই ব্যবসায়ীরা এখনো আওয়ামী লীগ আমলের মতো আচরণ করেন। তবে মারধরের বিষয়টি আংশিক স্বীকার করে তিনি বলেন, তার লোকজন ওই ব্যবসায়ীকে দুই-একটা বাড়ি (আঘাত) দিয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য
এ বিষয়ে বেড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নয়ন কুমার সরকার জানান, ব্যবসায়ী মিজানুর রহমানকে মারধরের ঘটনায় আজ বুধবার থানায় একটি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ ইতিপূর্বেই তদন্ত শুরু করেছে। তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ামাত্রই জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ও কঠোর আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।



