ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে টানা তৃতীয় দিনের মতো সংঘর্ষ হয়েছে। মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা ধরে চলা এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের সময় কয়েকটি বাড়ি ভাঙচুর ও অন্তত ২০টি দোকান লুট করা হয়েছে। সরাইল-নাসিরনগর-ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক সড়কে টানা তিন ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। আহতদের সরাইল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সংঘর্ষের সূত্রপাত
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দেড় বছর আগে ধর্মতীর্থ হাওরে মাছ ধরার জন্য সূর্যকান্দি গ্রামের মোশাররফ হোসেন ধর্মতীর্থ গ্রামের হাদিস মিয়ার কাছ থেকে বাকিতে চাঁই (মাছ ধরার বেড়) কেনেন। মোশাররফ হোসেন এখনও পুরো টাকা পরিশোধ করেননি। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। রবিবার সন্ধ্যায় এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এর জের ধরে উভয় গ্রামের লোকজন লাঠিসোঁটা, দা-বল্লম ও ইটপাটকেল নিয়ে সরাইল-নাসিরনগর-লাখাই আঞ্চলিক সড়কের কালীকচ্ছ বাজার এলাকায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। সরাইল থানার পুলিশ রাত ১১টার দিকে সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষ চলাকালে প্রতিপক্ষের বল্লমের আঘাতে হাদিস মিয়া নিহত হন। তিনি ধর্মতীর্থ গ্রামের শামছুল হকের ছেলে।
জানাজার পর পুনরায় হামলা
সোমবার সন্ধ্যায় ধর্মতীর্থ গ্রামে হাদিস মিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে কালীকচ্ছ বাজারে দুই পক্ষের লোকজন আসলে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে পুলিশসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। পরে পুলিশ এসে দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষ চলাকালে প্রায় দুই ঘণ্টা সরাইল-নাসিরনগর আঞ্চলিক সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল।
এ ঘটনার জেরে মঙ্গলবার বেলা ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত আবারও সংঘর্ষে জড়ায় উভয় পক্ষ। টানা তিন ঘণ্টা চলা সংঘর্ষে উভয় পক্ষের ৩০ জন আহত হন। সংঘর্ষ চলাকালে ২০টি দোকান ও কয়েকটি বাড়িঘর লুট করা হয়। এ সময় সরাইল-নাসিরনগর-ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক সড়কে টানা তিন ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল।
এলাকাজুড়ে আতঙ্ক
দুই গ্রামের লোকজনের মধ্যে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, দোকানপাট ভাঙচুর, লুট ও সড়ক অবরোধের কারণে এলাকাজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সরাইল উপজেলা জামায়াতের আমির মো. এনাম খান বলেন, ‘সংঘর্ষের খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই পক্ষকে বুঝিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বিশাল এলাকাজুড়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ায় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে বলেছি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য।’
কালীকচ্ছ ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) জায়েদা খাতুন বলেন, ‘টানা তিন দিন ধরে সংঘর্ষ চলছে। আজকের ঘটনা গত দুদিনের চেয়ে ভয়াবহ ছিল। দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুট করা হয়েছে। গত তিন দিনে সংঘর্ষে অন্তত ৭০ জন আহত হয়েছেন বলে খবর পেয়েছি। এ নিয়ে দুই গ্রামের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় আমরা উভয় পক্ষকে সংঘর্ষ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছি। তবে দুই পক্ষের লোকজন উত্তেজিত থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।’
প্রশাসনের বক্তব্য
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, ‘সংঘর্ষের খবর পেয়ে জেলা থেকে অন্তত শতাধিক অতিরিক্ত পুলিশ এনে প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আজকের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরবর্তী সংঘর্ষের আশঙ্কায় এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গত তিন দিনে অন্তত ৭০ জন আহত হয়েছেন। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’



