হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে কথিত ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ সিন্ডিকেট। গোয়েন্দা নজরদারিতে মালয়েশিয়াগামী একটি বড় চক্রের ৭৬ জন যাত্রীকে শনাক্ত করা হলেও শেষ পর্যন্ত বোর্ডিং গেটে পাঁচজন আটকা পড়েন। বিষয়টি জানাজানি হতেই বিমানবন্দর থেকে পালিয়ে যান আরও ৭১ জন। ঘটনাটি নিয়ে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত শুরু করেছে।
ঘটনার বিবরণ
শনিবার (৪ জুলাই) রাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা-মালয়েশিয়া রুটের বিজি-৩৮৬ ফ্লাইটকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেন, ‘ঘটনাটি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছি। বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত এবং পুরো নেটওয়ার্ক উদঘাটনে কাজ করছেন।’
সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গোয়েন্দারা আগেই জানতে পারেন, ওই রাতে ‘বডি কন্ট্রাক্ট’-এর মাধ্যমে একটি বড় গ্রুপ মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করবে। এরপর থেকেই সংশ্লিষ্ট ফ্লাইটের যাত্রীদের ওপর বিশেষ নজরদারি শুরু হয়। সন্দেহজনক যাত্রীদের পাসপোর্ট ও ভিসা পুনরায় যাচাইয়ের সময় একে একে অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
ফ্লাইট ও যাত্রী সংখ্যা
রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ফ্লাইটটিতে মোট ২৪৫ জন যাত্রীর ভ্রমণের কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ৭৬ জন যাত্রী বিমানে ওঠেননি। এর মধ্যে বোর্ডিং গেটে পাঁচজনের পাসপোর্ট ও ভিসার তথ্যের অসঙ্গতি ধরা পড়ায় তাদের অফলোড করা হয়। সূত্র জানায়, ওই পাঁচজনকে আটকে দেওয়ার খবর দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর একই গ্রুপের আরও ৭১ জন যাত্রী বোর্ডিং না করেই কৌশলে বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। ফলে তারাও আর মালয়েশিয়াগামী ফ্লাইটে ওঠেননি।
গোয়েন্দাদের ধারণা ও তদন্ত
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট যাত্রীরা সবাই ট্যুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। তবে একটি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে সেখানে গিয়ে অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। গোয়েন্দারা বিষয়টি মানবপাচারের একটি সম্ভাব্য কৌশল হিসেবে দেখছেন।
ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে, ভিসায় অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এসব যাত্রী চেক-ইন ও ইমিগ্রেশনের একাধিক স্তর পার হয়ে বোর্ডিং গেট পর্যন্ত পৌঁছালেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চেক-ইন কাউন্টারে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাদের ভিসা ‘ভেরিফায়েড’ হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং পরে ইমিগ্রেশন থেকেও বিদেশযাত্রার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু বোর্ডিং গেটে পুনরায় যাচাইয়ের সময় পাঁচজনের ভিসা জাল বা অবৈধ বলে শনাক্ত হয়।
সিন্ডিকেটের কার্যক্রম ও পূর্বের ঘটনা
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ নামে পরিচিত একটি সংঘবদ্ধ চক্র অর্থের বিনিময়ে জাল বা ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্র ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করিয়ে বিদেশ পাঠানোর চেষ্টা করে। এ কাজে বিমানবন্দরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বাইরের দালালদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। সূত্র আরও জানায়, সম্প্রতি কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে বিমানবন্দরে কর্মরত কিছু অসাধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে বডি কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে মানবপাচারে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। ওই অভিযানের পর কিছুদিন এ ধরনের কর্মকাণ্ড কমে এলেও সর্বশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোয়েন্দাদের ধারণা, চক্রটি আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে।
তদন্তের অগ্রগতি
এ ঘটনায় কারা জড়িত, কীভাবে যাত্রীরা ইমিগ্রেশন পার হলেন এবং কোন ট্রাভেল এজেন্সি বা সিন্ডিকেট পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করেছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।



