বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম রোববার বলেছেন, নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর উচিত ছিল বাংলাদেশে গত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমর্থন দেওয়ার জন্য ক্ষমা চাওয়া।
ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্য প্রসঙ্গে নাহিদের মন্তব্য
সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে নাহিদ ভারতের বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ড ও শরিফ ওসমান হাদি হত্যার সাথে জড়িতদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও আনেন।
তিনি বলেন, “নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার বাংলাদেশে এসে আকাশ ও মাটি ভাগ করে নেওয়ার মিষ্টি কথা বলতে শুরু করেছেন। কিন্তু আমরা গত ১৬ বছর ভুলিনি।” নাহিদের মতে, ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত ছিল আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন ও জুলাই হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্তদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য ক্ষমা চাওয়া।
তিনি বলেন, ভারতীয় হাইকমিশনারকে বরং বর্ণনা করা উচিত ছিল যে নয়া দিল্লি কীভাবে মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সাথে নতুন সম্পর্ক গড়তে চায়।
সীমান্ত হত্যা ও অনুপ্রবেশের অভিযোগ
বিএনপি নেতা সীমান্ত হত্যার ঘটনাও সমালোচনা করে দাবি করেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ ১০ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, ভারত অবৈধ বাংলাদেশি নাগরিক বলে চিহ্নিত করে লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বাজেট অধিবেশনে ‘পুশ-ইন’ ইস্যু নিয়ে আলোচনার জন্য সময় বরাদ্দ না করায় হতাশা প্রকাশ করে নাহিদ বলেন, “জাতীয়তাবাদী শব্দটি ধারণকারী দল হিসেবে আমরা দেখতে চাই কীভাবে সরকার সীমান্ত হত্যা বন্ধ করে। আমরা এ ব্যাপারে পূর্ণ সহযোগিতা দেব।” তিনি সীমান্তে প্রতিরোধের জন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) প্রশংসা করেন।
পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রীর মন্তব্য প্রসঙ্গে
পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী সুবেণ্দু অধিকারীর মন্তব্যের সমালোচনা করে নাহিদ বলেন, ভারতীয় রাজনীতিবিদ বাংলাদেশ সম্পর্কে ‘বেপরোয়া’ মন্তব্য করছেন। “বাংলাদেশ সরকার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কঠোর জবাব দিতে হবে,” তিনি বলেন।
বাংলাদেশ ও কলকাতার ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক চায়। সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি বাক্য নয়, বাস্তবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দেশীয় ইস্যুতে নাহিদের বক্তব্য
দেশীয় ইস্যুতে নাহিদ সরকারকে দুর্নীতি দমন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং বড় আকারের অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
ব্যাংক রেজোলিউশন আইন প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সংস্কার বড় ঋণখেলাপিদের পুনরায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তিনি যুক্তি দেন, বড় ঋণখেলাপি, অর্থ পাচার ও আর্থিক অপরাধে জড়িত ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী গ্রুপের বিরুদ্ধে শক্ত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান আইন অপর্যাপ্ত কারণ পূর্ববর্তী প্রশাসনের অধীনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো allegedly আর্থিক অনিয়ম সহজতর করতে ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি বড় আর্থিক অপরাধ মোকাবেলায় নতুন আইন প্রণয়ন এবং দুর্নীতির মাধ্যমে প্রাপ্ত ঋণের জামানত হিসেবে ব্যবহৃত সম্পদ জাতীয়করণের আহ্বান জানান।
আদানি ও সামিট চুক্তি প্রসঙ্গে প্রশ্ন
বিরোধী চিফ হুইপ ভারতের আদানি গ্রুপ ও সামিট গ্রুপের সাথে চুক্তি সম্পর্কে সরকার কী পদক্ষেপ নিতে চায় তা প্রশ্ন করেন। তিনি বলেন, এই চুক্তি চ্যালেঞ্জ করতে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি প্রমাণ করতে হবে।
প্রতিরক্ষা বরাদ্দ ও সংস্কার
প্রতিরক্ষা বরাদ্দ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নাহিদ বলেন, অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় প্রতিরক্ষা কৌশল উল্লেখ করতে একটি অনুচ্ছেদও বরাদ্দ করেননি। তিনি বলেন, অধিকাংশ প্রতিরক্ষা বরাদ্দ দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পরিবর্তে পরিচালন ব্যয়ে যাবে।
তিনি আরও যুক্তি দেন, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক সংস্কার সম্ভব নয়। তিনি প্রশ্ন করেন, সরকার দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগ ও সংবিধান সংস্কার করবে কিনা। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়নের জন্য রাজনৈতিক সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কার কমিশন ও অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশনের কী অবস্থা জানতে চেয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, এই উদ্যোগ পরিত্যাগ করা জাতিকে বিভ্রান্ত করার শামিল কিনা।



