স্বাস্থ্য বাজেট বাড়লেও খরচের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
স্বাস্থ্য বাজেট বাড়লেও খরচের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ

দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্য খাতে কম বরাদ্দের ধারা ভেঙে সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে সংসদে বাজেট পাসের আগে চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে তবেই বাস্তবায়ন সম্ভব।

নাগরিকদের পকেট থেকে চিকিৎসা খরচের বোঝা

বাংলাদেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয় বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। বর্তমানে ব্যক্তিদের নিজেদের পকেট থেকে ৭০% পর্যন্ত চিকিৎসা খরচ বহন করতে হয়। ফলে অনেক দরিদ্র পরিবার চিকিৎসা সেবা নিতে পারে না। গত কয়েক বছরে হাজার হাজার নবীন স্নাতক, যারা অতি দারিদ্র্য থেকে নিম্ন আয়ের স্তরে উঠতে পেরেছিলেন, তারা আবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন।

বাজেট বরাদ্দের ইতিহাস ও বর্তমান প্রস্তাব

ঐতিহাসিকভাবে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের প্রায় ৫% ছিল। প্রথমবারের মতো সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই বরাদ্দ ৭.৪% করার প্রস্তাব দিয়েছে। এটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১% এর কিছু বেশি, যা আগের অর্থবছরে ছিল মাত্র ০.৫৮%।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পকেট থেকে চিকিৎসা খরচ কমানো কি সম্ভব?

বরাদ্দ বাড়লেই কি পকেট থেকে চিকিৎসা খরচ কমবে? সরাসরি উত্তর নেই। প্রকৃত ফলাফল নির্ভর করে স্বাস্থ্য প্রশাসন কীভাবে এই বর্ধিত তহবিল ব্যয় করে বা আদৌ ব্যয় করতে পারে কিনা তার উপর। সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে, বরাদ্দকৃত বাজেট ব্যবহারে স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা খুবই দুর্বল।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় বাজেট অপচয়

কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও স্বাস্থ্য প্রশাসন বরাদ্দকৃত বাজেট ব্যয় করতে ব্যর্থ হয়েছিল। জরুরি সরঞ্জাম, আইসিইউ ও অক্সিজেনের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও মন্ত্রণালয় ও এর অধীন দপ্তরগুলো টেন্ডার প্রক্রিয়াকরণ এবং নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগে ধীরগতি দেখায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে ব্যর্থতা

স্বাস্থ্য খাত নিয়মিত উন্নয়ন প্রকল্প সময়মতো শেষ করতে ব্যর্থ হয়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, মনিটরিং ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকল্প পিছিয়ে গেলে মধ্যমেয়াদি বাজেট সংশোধনে বরাদ্দ কমিয়ে দেয় বা অব্যয়িত অর্থ অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফেরত যায়। গবেষণা সংস্থা উন্মেষণ শামান্নায়'র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিচালন ব্যয়ের ৯২% ব্যবহার করলেও উন্নয়ন ব্যয়ের মাত্র ৭৬% ব্যবহার করে। অর্থাৎ উন্নয়ন বরাদ্দের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অপচয় হয়।

অবকাঠামো থাকলেও সেবার অভাব

দূরবর্তী গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্য অবকাঠামো বাড়লেও প্রকৃত সেবার অভাব রয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট, ডাক্তার ও সহায়ক কর্মীর অভাবে রোগীরা মানসম্মত সেবা পেতে জেলা সদর বা বড় শহরে যেতে বাধ্য হন। বাংলাদেশিরা চিকিৎসার জন্য বছরে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশে ব্যয় করে, প্রধানত ভারত ও থাইল্যান্ডে।

জনবল সংকট

বাংলাদেশে ডাক্তার-জনসংখ্যা অনুপাত যুক্তিসঙ্গত হলেও প্রশিক্ষিত নার্স, মিডওয়াইফ ও টেকনিশিয়ানের তীব্র সংকট রয়েছে। প্রায় ৭৫% ডাক্তার ও নার্স শহরাঞ্চলে সেবা দেন, যেখানে অধিকাংশ জনগণ গ্রামে বাস করে।

অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বাজেটের অভাব

বাংলাদেশে মৃত্যুর ৭১% এর জন্য দায়ী অসংক্রামক রোগ (এনসিডি), কিন্তু স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৪.২% এনসিডি নিয়ন্ত্রণে ব্যয় হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫ সালের স্বাস্থ্য ও অসুস্থতা জরিপ অনুযায়ী উচ্চ রক্তচাপ দেশের প্রধান রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে কার্ডিওভাসকুলার রোগে ২৮৩,৮০০ জন মারা গেছেন, যার ৫২% উচ্চ রক্তচাপজনিত। গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপ স্ক্রিনিং ও চিকিৎসায় প্রতিটি ১ টাকা বিনিয়োগে ১৮ টাকা রিটার্ন আসে।

ভবিষ্যৎ করণীয়

বর্ধিত বাজেট বাস্তবায়নে এনসিডি নিয়ন্ত্রণ, গ্রাম-শহরের বৈষম্য দূরীকরণ, দূরবর্তী এলাকায় ডাক্তার নিয়োগ ও রাখার প্রণোদনা, শূন্য পদ পূরণ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও যন্ত্রপাতির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বিগত ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।