মিথ্যা মামলায় বিএনপি নেতাকে এক লাখ টাকা জরিমানা, আদালতের কঠোর রায়
রাজশাহীর এক বিএনপি নেতাকে মিথ্যা মামলা দায়েরের অভিযোগে এক লাখ টাকা জরিমানা করেছেন আদালত। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন তিনি কারাগারে থাকা সত্ত্বেও ভোটকেন্দ্রে মারধরের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করে মামলা করেছিলেন তিনি। রোববার (১২ এপ্রিল) দুপুরে রাজশাহী মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩ এর বিচারক মো. সাদ্দাম হোসেন এই রায় দেন।
মামলার পটভূমি ও বিচারিক প্রক্রিয়া
দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম সাজ্জাদ হোসেন (৪৬)। তিনি হরিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার বাড়ি বেলুয়া খোলাবোনা গ্রামে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন তিনি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন। অথচ সেদিন ভোট দিতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করে মিথ্যা মামলা দায়ের করেন তিনি।
গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২৩ আগস্ট রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের দামকুড়া থানায় এই মামলা করেন সাজ্জাদ হোসেন। মামলায় হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বজলে রেজভী আল হাসান মুঞ্জিল, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সাইদুর রহমান বাদলসহ মোট ১৩ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছিল।
মিথ্যা অভিযোগের বিবরণ ও আদালতের সিদ্ধান্ত
এজাহারে সাজ্জাদ হোসেন উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ চলাকালে তিনি কসবা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে যান। সেখানে আসামিরা তাকে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেন এবং হুমকি প্রদান করেন। তিনি আরও দাবি করেন যে, আসামিরা পিস্তল ও লাঠি দিয়ে তাকে মারধর করে রক্তাক্ত জখম করেন। তবে আদালতে প্রমাণিত হয় যে, ওই তারিখে তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন, ফলে তার দায়ের করা মামলার ঘটনার বিবরণ সন্দেহাতীতভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের আদালত পরিদর্শক আব্দুর রফিক জানান, মামলার ঘটনার তারিখে সাজ্জাদ হোসেন কারাগারে ছিলেন। অথচ ওই তারিখে তাকে ভোটকেন্দ্রে মারধরের অভিযোগে মিথ্যা মামলা করেন। মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকে এক লাখ টাকা জরিমানা করেছেন।
জরিমানার শর্ত ও আসামিদের ক্ষতিপূরণ
আদালতের রায় অনুযায়ী, মামলায় কারাভোগ করা দুই আসামি জরিমানার অর্থ পাবেন। তারা প্রত্যেকে ৫০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ পাবেন। সাত দিনের মধ্যে জরিমানার অর্থ পরিশোধ করে ব্যাংক চালানের কপি আদালতে জমা দিতে হবে। তা না হলে বাদী সাজ্জাদ হোসেনকে একমাস কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
মামলার বাদী বিএনপি নেতা সাজ্জাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, "আদালত উল্টো আমাকেই এক লাখ টাকা জরিমানা করেছেন। ৭ দিনের মধ্যে জরিমানার টাকা দিতে হবে। তা না হলে একমাস জেল খাটতে হবে। এখন কী করি!" মামলাটি মিথ্যা কি না জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেন, "আমি তো আসলে রাজনৈতিক মামলায় জেলে ছিলাম। মামলা করার সময় বিষয়টা মনে ছিল না। আদালতে যখন প্রমাণিত হয়েছে তখন মামলা মিথ্যাই ছিল।"
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আইনগত গুরুত্ব
এই ঘটনা রাজনৈতিক মামলা ও মিথ্যা অভিযোগের তীব্রতা তুলে ধরেছে। আদালতের এই সিদ্ধান্ত মিথ্যা মামলা দায়েরের বিরুদ্ধে একটি দৃঢ় বার্তা প্রদান করে, যা আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে, যাতে তারা ভিত্তিহীন অভিযোগ এড়িয়ে চলেন।
রাজশাহী এলাকায় এই মামলাটি স্থানীয় রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সতর্কতা বৃদ্ধি করেছে। আদালতের এই রায় ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা ভবিষ্যতে অনুরূপ মিথ্যা মামলা প্রতিরোধে সহায়ক হবে।



