আইনমন্ত্রীর হবস-লক বক্তব্যের জবাবে সাবেক বিচারপতি মতিনের প্রশ্ন: 'আমরা কি স্বৈরশাসক চাই?'
আইনমন্ত্রীর হবস-লক বক্তব্যের জবাবে সাবেক বিচারপতি মতিন

আইনমন্ত্রীর হবস-লক বক্তব্যের জবাবে সাবেক বিচারপতি মতিনের তীব্র প্রতিক্রিয়া

জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের হবস, লক ও রুশোর প্রসঙ্গ তুলে দেওয়া বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন সাবেক বিচারপতি এম এ মতিন। গত ২৯ মার্চ সংসদ অধিবেশনে আইনমন্ত্রী জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে আলোচনায় ইংরেজ দার্শনিক থমাস হবস, জন লক এবং ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জঁ-জাক রুশোর সামাজিক চুক্তি মতবাদের বই উপস্থাপন করেছিলেন। বিরোধীদলীয় নেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি মদিনা সনদেরও উল্লেখ করেন।

'আমরা কি আবার স্বৈরশাসক চাচ্ছি?'

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে 'জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন কেন অপরিহার্য?' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধে সাবেক বিচারপতি মতিন আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন এই গোলটেবিলের আয়োজন করে। প্রবন্ধে তিনি বলেন, 'শোনা যাচ্ছে, জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী সংসদ সদস্যগণকে হবস পড়ার উপদেশ দিয়েছেন। হবসের দর্শন হচ্ছে—দেশের শাসক হবেন এমন একজন, যিনি হবেন সর্বশক্তিমান এবং সকল আইনের ঊর্ধ্বে। যেমন রোমান সম্রাটরা ছিল। হবসের দর্শন অনুসরণ করে সে যুগে স্বৈরাচার জন্ম নিয়েছিল। আমরা কি আবার স্বৈরশাসক চাচ্ছি?'

আইনমন্ত্রী ও শেখ হাসিনার প্রসঙ্গে তীব্র মন্তব্য

প্রবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, আগের আইনমন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হবস পড়িয়েছিলেন এবং জন অস্টিনের 'কমান্ড থিওরি' ভালো করে শিখিয়েছিলেন। ফলে তাঁকে শেখানো হয়েছে—শাসকের আদেশই আইন। অথচ অস্টিনের জায়গা এইচ এল হার্ট দখল করার পর ইউরোপের আইনের জগতে সন্নিবেশিত হয়—আদেশ নয়, বিধিই আইন। কিন্তু হাসিনাকে সেই আইন পড়ানো হয়নি। প্রবন্ধে দাবি করা হয়, হাসিনাসহ তাঁর আইনমন্ত্রী 'হায়ার ল' অমান্য করেছিলেন এবং প্রশ্ন তোলা হয়, 'তাঁরা আজ কোথায়?'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জন লকের একটি মতবাদ উদ্ধৃত করে প্রবন্ধে বলা হয়, শাসক যখন নির্যাতক হয়ে যায়, তখন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে সরিয়ে দেওয়া মানুষের স্রষ্টা প্রদত্ত অধিকার। এই বক্তব্যে আইনমন্ত্রীর আলোচিত তিন রাষ্ট্রচিন্তাবিদের দর্শনের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে।

তিন রাষ্ট্রচিন্তাবিদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে যেসব রাষ্ট্রচিন্তাবিদের সামাজিক চুক্তি মতবাদ নিয়ে আলোচনা এসেছে, তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:

  • থমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯): ইংরেজ দার্শনিক ও আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'লেভিয়াথান' (১৬৫১)। তিনি মনে করতেন, মানুষ জন্মগতভাবে স্বার্থপর ও বিশৃঙ্খল, তাই সমাজ শান্ত রাখতে একজন সর্বশক্তিমান শাসকের প্রয়োজন। তাঁর মতে, জনগণ নিরাপত্তার স্বার্থে শাসকের কাছে সব ক্ষমতা সঁপে দেয় এবং শাসকের আদেশ অমান্য করার অধিকার তাদের থাকে না।
  • জন লক (১৬৩২-১৭০৪): ইংল্যান্ডের চিকিৎসক ও দার্শনিক, যাকে 'উদারতাবাদের জনক' বলা হয়। তাঁর প্রধান কাজ 'টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট' (১৬৮৯)। হবসের বিপরীতে লক বলেন, মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার হলো প্রাকৃতিক অধিকার। সরকার গঠিত হয় জনগণের সম্মতিতে এই অধিকার রক্ষার জন্য। যদি শাসক অত্যাচারী হন, তবে সরকার উৎখাত করার অধিকার জনগণের রয়েছে।
  • জঁ-জাক রুশো (১৭১২–১৭৭৮): জেনেভায় জন্ম নেওয়া ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, 'দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট' (১৭৬২) গ্রন্থের জন্য বিখ্যাত। তিনি বলেছিলেন, 'মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়, কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলিত।' তাঁর মতে, রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া উচিত 'সাধারণ ইচ্ছা' বা জনগণের সামষ্টিক মতের ভিত্তিতে, যা আধুনিক গণতন্ত্র ও ফরাসি বিপ্লবের ভিত্তি তৈরি করে।

এই গোলটেবিল বৈঠকে সাবেক বিচারপতি মতিনের বক্তব্য সংবিধান সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়, পাশাপাশি আইনমন্ত্রীর দার্শনিক উদ্ধৃতির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে সমালোচনা করে।