গুমের বিচারে ঐতিহাসিক আইন পাস: মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত
জাতীয় সংসদে একটি যুগান্তকারী আইন পাস হয়েছে, যা গুমকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এর বিচারের পথ প্রশস্ত করেছে। 'ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালস (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল ২০২৬' মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সংসদ অধিবেশনে কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়, যার মাধ্যমে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনা হয়েছে।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্য: সরকারের সদিচ্ছার প্রতিফলন
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিলটি উত্থাপন করে এর উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, "এই বিলের মাধ্যমে আমরা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের বিচারকে সঠিক পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য গুমকে একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছি। যারা বলছেন, আমরা গুমের বিচার চাচ্ছি না, তাদের বলবো—এই আইনটা ভালো করে পড়ে দেখবেন। গুম আগে মানবতাবিরোধী অপরাধের তালিকায় ছিল না। আমরা তা অন্তর্ভুক্ত করে বিচারের ব্যাপারে আমাদের সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছি।"
আইনমন্ত্রী আরও জোর দিয়ে বলেন, "বাইরে গুমের বিচার করার ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছাকে অনেকে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেছেন। এই সরকার গুমের সঙ্গে সম্পৃক্ত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে কতটা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, তা এই বিলের মাধ্যমে পুরো সংসদ ও দেশবাসীকে জানালাম।" তাঁর মতে, এই সংশোধনী গুমের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার আইনি ভিত্তিকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করেছে।
সংসদীয় আলোচনা ও বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া
বিলটি পাসের পর সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, "নির্দিষ্ট সময় যখন আসবে তখন আলোচনায় আমরা অংশ নেবো। এখনই এই ব্যাপারে আর কিছু বলতে চাচ্ছি না।" তাঁর এই মন্তব্যে বিরোধী দলের সংযত অবস্থান ফুটে উঠেছে।
আলোচনার এক পর্যায়ে স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন আইনমন্ত্রীর উদ্দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, "মাননীয় মন্ত্রী, বাইরে কত লোক কত কথা বলে। আপনি সংসদের আলোচনা ও সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের মধ্যে আপনার বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখেন। বাইরের কথা শোনার প্রয়োজন সংসদীয় আইনে নেই। বিধি অনুযায়ী, যেটুকু করতে হবে সে ব্যাপারে আমরা কাজ করছি।" স্পিকারের এই বক্তব্য সংসদীয় প্রক্রিয়ার প্রতি আনুগত্যের উপর জোর দেয়।
আইনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রভাব
এই বিলটি ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টের অধিকতর সংশোধন কল্পে উত্থাপন করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, বিলটি পাসের মধ্য দিয়ে গুমের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার আইনি ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে। এটি একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে, যা নিম্নলিখিত দিকগুলো তুলে ধরে:
- গুমকে আনুষ্ঠানিকভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের বিচারের পথ সুগম হয়েছে।
- সরকারের গুমের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের প্রতিজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছে।
- গুমের শিকারদের জন্য ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই আইন পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে, যা মানবাধিকার রক্ষা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দিকে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন যে, এটি ভবিষ্যতে গুমের মতো গুরুতর অপরাধের মোকাবিলায় আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।



