ডিজিএফআই-এর সাবেক পরিচালক আফজাল নাছের আদালতে দাবি: 'শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে চেয়েছি' অভিযোগ অসত্য
প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক পরিচালক আফজাল নাছের আদালতে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, শেখ হাসিনাকে তিনি 'ক্ষমতায় রাখতে চেয়েছিলেন' বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। বরং তিনি নিজেই বৈষম্যের শিকার বলে দাবি করেন। রোববার (৫ এপ্রিল) ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন মো. সেফাতুল্লাহর আদালতে বিএনপি কর্মী মকবুল হোসেন হত্যা মামলায় রিমান্ড শুনানিতে এসব কথা বলেন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা।
গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের ঘটনাক্রম
গত ২৯ মার্চ গভীর রাতে ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএসের একটি বাসা থেকে সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আফজাল নাছেরকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরদিন জুলাই আন্দোলনে দেলোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তি নিহতের মামলায় তার ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। রিমান্ড শেষে রোববার তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই কফিল উদ্দিন। ওই মামলায় তাকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
এরপর মকবুল হত্যা মামলায় আফজাল নাছেরকে গ্রেপ্তার দেখানোসহ পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের মতিঝিল জোনাল টিমের এসআই তোফাজ্জল হোসেন। পরে সে বিষয়ে শুনানি হয়। প্রথমে আদালত আফজাল নাছেরকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেয়। এরপর রিমান্ডের বিষয়ে শুনানি হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তি
রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, 'তিনি (আফজাল নাছের) ডিজিএফআইয়ে কর্মরত ছিলেন। ওয়ান ইলেভেনের কর্মকাণ্ডে জড়িত। ইউনাইটেড হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে আছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার কারণে সেখানে খালেদা জিয়াকে ভর্তি করা যায়নি। অথচ শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য নেতাকর্মীরা সেখান থেকে চিকিৎসা পায়। হাসিনার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে। মকবুল হত্যা মামলায় তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তদন্ত কর্মকর্তা তার পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়েছে।'
আসামিপক্ষে শওকত উল্লাহ রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিন প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, 'মিরপুর থানার মামলায় তাকে (আফজাল নাছের) ৬ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। এ মামলায়ও তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ড আবেদন করেছে। বলা হচ্ছে, উনি ইউনাইটেড হাসপাতালে ছিলেন। অথচ তখন তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালে ছিলেনই না। ওয়ান ইলেভেনে কোনো ভূমিকা পালন করেননি। তার রিমান্ড বাতিল করে জামিন প্রার্থনা করছি।'
আফজাল নাছেরের বক্তব্য
এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আফজাল নাছের আদালতের অনুমতি নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, 'আমাকে শেখ হাসিনার সময়ে ২০০৯ সালে ৯ নভেম্বর কারণ দর্শানোর নোটিস ছাড়াই বরখাস্ত করা হয়। ২৬ বছর চাকরি করার পর এক কাপড়ে বের করে দেওয়া হয়। পেনশনও পাইনি। আমি ইউনাইটেড হাসপাতালে কখনো চাকরি করিনি। এটা ইউনাইটেডের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান নয়, সিস্টার কনসার্ন।'
তিনি আরও বলেন, 'সেখানে (ইউনাইটেড হাসপাতালে) ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয়নি। সেটা তো আমার কাজ না। সেখানকার কর্মকর্তাদের কাজ। ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যদি ক্ষতি করতে চান, করতে পারেন। এখন আমি আসামির কাঠগড়ায়। বিচার করেন, সঠিক বিচার। তবে সরকার যদি চায় যে কোনভাবে ক্ষতি করতে পারে।'
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, 'আমি নিজেই বৈষম্যের শিকার। কেন শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে চাইব? যেখানে তার দ্বারা আমি বৈষম্যের শিকার। সোশাল মিডিয়া দেখেন, আমি যদি জড়িত থাকি, আমার ডবল শাস্তি হোক। আল্লাহ বিচার একভাবে করেনি।'
আদালতের সিদ্ধান্ত ও মামলার পটভূমি
শুনানি শেষে আদালত থেকে তার তিন দিনের রিমান্ডের আদেশ আসে। এরপর তাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এ মামলার বিবরণে বলা হয়, ২০২২ সালের ১০ ডিসেম্বর একদফা দাবি আদায়ের কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি। এর আগে ৭ ডিসেম্বর ডিবি পুলিশের হারুন অর রশীদ, মেহেদী হাসান ও বিপ্লব কুমার বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ে অভিযান চালান। এ সময় কার্যালয়ে ভাঙচুরও চালানো হয়। একই সময় ককটেল হামলা, টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও গুলিতে বিএনপির কয়েকশ নেতাকর্মী আহত হন। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মকবুল হোসেন নামে এক কর্মী। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মাহফুজুর রহমান নামে এক ব্যক্তি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৫৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।



