ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হল হত্যা মামলায় দুই আসামির জামিন: আদালতে আত্মসমর্পণ ও আইনি বিতর্ক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে তোফাজ্জল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় দুই আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়েছেন। রোববার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালতে তাঁরা আত্মসমর্পণ করেন। শুনানি শেষে আদালত মামলার পরবর্তী ধার্য তারিখ পর্যন্ত তাঁদের জামিন মঞ্জুর করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. হারুন অর রশিদ।
আসামিদের পরিচয় ও আদালত কার্যক্রম
জামিনপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন ফজলুল হক মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. আবু রায়হান (২৩) ও রেদোয়ানুর রহমান পারভেজ (২৪)। আদালত সূত্রে জানা যায়, এদিন আসামিরা আদালতে আত্মসমর্পণের পর আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে জামিন বাতিলের শুনানি করেন আইনজীবী মো. হারুন অর রশিদ। আসামিপক্ষে জামিনের আবেদন করেন মোহাম্মদ আলী বাবু।
মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘এই দুই আসামি হত্যার সঙ্গে জড়িত নন। চার্জশিটে স্পষ্টভাবে বলা আছে, তাঁরা আসল আসামিরা যেন পালাতে না পারে, সে জন্য সহযোগিতা করেছেন। শুধু শত্রুতামূলকভাবে একজনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তাঁদের নাম উঠে আসে। এ বিষয়ে হাইকোর্টের একটি রুলিং থাকার কারণে চার্জশিট থেকে অব্যাহতি দিতে পারে নাই। আমরা ন্যায়বিচার চাই।’
মামলার পটভূমি ও ঘটনার বিবরণ
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৮টার দিকে এক যুবককে ফজলুল হক মুসলিম হলের গেটে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখে কয়েকজন শিক্ষার্থী আটক করেন। তাঁরা তাঁকে প্রথমে হলের গেস্টরুমে নিয়ে মুঠোফোন চুরির অভিযোগে মারধর করেন। পরে তাঁকে মানসিক রোগী মনে করে ক্যানটিনে খাওয়ানো হয়।
এজাহার অনুযায়ী, পরে তাঁকে দক্ষিণ ভবনের গেস্টরুমে নিয়ে জানালার সঙ্গে হাত বেঁধে স্ট্যাম্প, হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে আবার মারধর করা হয়। এতে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার পর ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর শাহবাগ থানায় মামলা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ।
আরেকটি মামলা ও তদন্তের নির্দেশ
পরে ২৫ সেপ্টেম্বর নিহত ব্যক্তির ফুফাতো বোন মোসাম্মৎ আসমা আক্তার ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক শাহ মুহাম্মদ মাসুমসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে আরেকটি মামলার আবেদন করেন। আদালত সেদিন বাদীর জবানবন্দি নিয়ে উভয় মামলার তদন্ত একসঙ্গে করার নির্দেশ দেন।
এর আগে গত বছরের ১ জানুয়ারি মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার পুলিশ পরিদর্শক আসাদুজ্জামান ২১ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেন। তবে অন্য আসামিদের জবানবন্দিতে নাম আসা আটজনকে অব্যাহতি দেওয়ায় বাদীপক্ষ নারাজি আবেদন করে। আদালত ওই আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন।
সম্পূরক চার্জশিট ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
এরপর ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে ২৮ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. হান্নানুল ইসলাম। এ বছরের ১০ মার্চ আদালত সম্পূরক চার্জশিট গ্রহণ করে পলাতক থাকা ২২ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন।
এই মামলাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে সংঘটিত একটি গুরুতর অপরাধের প্রতিফলন, যা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আদালতের সিদ্ধান্ত ও তদন্তের অগ্রগতি এখন সকলের নজরে রয়েছে।



