সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বছর বহাল, নতুন শাস্তিমূলক বিধান পাস
জাতীয় সংসদে রোববার (৫ এপ্রিল) সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা নির্ধারণ এবং চাকরির শৃঙ্খলা সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে। ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ এবং ‘সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যানসিয়াল করপোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থাগুলোতে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ বিল, ২০২৬’ কণ্ঠভোটে অনুমোদন লাভ করে।
দ্রুততম পাসের রেকর্ড
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দুটি বিল পাস করতে সময় লেগেছে মাত্র আট মিনিট। বিল দুটি নিয়ে সংসদে কোনো আলোচনা হয়নি এবং বিরোধী দলের সদস্যরাও কণ্ঠভোটে পক্ষে বা বিপক্ষে অংশ নেননি। এই প্রক্রিয়াটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু পাসের সংসদীয় বিশেষ কমিটির সুপারিশের ধারাবাহিকতায় সম্পন্ন হয়েছে।
কর্মচারীদের জন্য নতুন শাস্তিমূলক বিধান
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী সংসদে উপস্থাপিত ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এ সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন শাস্তিমূলক বিধান যুক্ত করা হয়েছে। বিলে ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনে একটি নতুন ধারা (৩৭ক) সংযোজন করে বলা হয়েছে:
- ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ অমান্য করা
- আইনসংগত কারণ ছাড়া সরকারের আদেশ, পরিপত্র ও নির্দেশ অমান্য করা বা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করা
- অন্যান্য কর্মচারীদের সঙ্গে সমবেতভাবে নিজ কর্ম থেকে অনুপস্থিত থাকা
- কোনো সরকারি কর্মচারীকে কর্মে উপস্থিত হতে বা কর্তব্য সম্পাদনে বাধাগ্রস্ত করা
এসব ‘সরকারি কর্মে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অসদাচরণ’ এর জন্য তিন ধরনের দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে:
- নিম্নপদ বা নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমন
- বাধ্যতামূলক অবসর
- চাকরি থেকে বরখাস্ত
তদন্ত প্রক্রিয়া ও আপিলের সুযোগ
বিল অনুযায়ী, অভিযোগ গঠনের পর সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিস দিতে হবে। কারণ দর্শানো ও শুনানির পর অভিযোগের ভিত্তি পাওয়া গেলে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। তদন্ত কমিটির সদস্যদের অভিযুক্ত ব্যক্তির চেয়ে পদে জ্যেষ্ঠ হতে হবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি নারী হলে কমিটিতে অন্তত একজন নারী সদস্য রাখতে হবে।
কমিটিকে ১৪ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে হবে, যুক্তিসংগত কারণে এ সময় একবারের জন্য সর্বোচ্চ সাত কার্যদিবস বাড়ানো যাবে। নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ না হলে নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। কোনো কর্মচারীকে দণ্ড দেওয়া হলে তিনি ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে আপিল করতে পারবেন, যদিও রাষ্ট্রপতির আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা না গেলেও ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তার কাছে রিভিউ চাওয়া যাবে।
চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বছর বহাল
দ্বিতীয় বিলে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছরই বহাল রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের সব ক্যাডারে এবং বিসিএসের বাইরে সব সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা হবে ৩২ বছর। এ ছাড়া স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যানসিয়াল করপোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থাগুলোর যেসব পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ৩০ বছর বা ‘অনূর্ধ্ব ৩২ বছর’ উল্লেখ আছে, সেসব ক্ষেত্রে তা ৩২ বছর হিসেবে গণ্য হবে।
তবে বিলের উপধারায় বলা হয়েছে, যেসব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যানসিয়াল করপোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থার কোনো পদে সরাসরি নিয়োগের বয়সসীমা আগে থেকেই ৩২ বছরের বেশি নির্ধারিত আছে, সেসব ক্ষেত্রে সেই বয়সসীমা অপরিবর্তিত ও বহাল থাকবে। প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিয়োগবিধি বা প্রবিধানও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
বিলের উদ্দেশ্য ও পরবর্তী পদক্ষেপ
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়, সরকারি কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, আনুগত্য প্রতিষ্ঠা, বিশৃঙ্খলা প্রতিহতকরণ এবং দ্রুত আইনগত কার্যক্রম গ্রহণের ব্যবস্থার জন্য এ সংশোধন আনা হয়েছে। চাকরিপ্রার্থীদের প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির দাবি এবং বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে ২০২৪ সালের অধ্যাদেশে সরকারি চাকরিতে সরাসরি নিয়োগের বয়সসীমা দুই বছর বাড়িয়ে ৩২ বছর করা হয়েছিল।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন বিসিএসে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর রেখে সার্কুলার জারি করে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু রেখেছে, তাই অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করা আবশ্যক ছিল। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেলে বিল দুটি আইনে পরিণত হবে, যা সরকারি চাকরির নিয়মকানুনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে।



