মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর তৃতীয় দফায় রিমান্ড আদেশ, আদালতের সিদ্ধান্তে তিনদিনের হেফাজত
মানবপাচার আইনে করা মামলায় এক-এগারোর সময়ের আলোচিত সেনা কর্মকর্তা ও ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে তৃতীয় দফায় তিনদিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। শনিবার শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলমের আদালত এ আদেশ দেন।
শুনানিতে উভয়পক্ষের যুক্তি ও আদালতের রায়
দ্বিতীয় দফায় ছয়দিনের রিমান্ড শেষে আসামিকে আদালতে হাজির করে ফের চারদিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক মো. রায়হানুর রহমান। তিনি আদালতে দাবি করেন, গত দুই দফার রিমান্ডে সব তথ্য পাওয়া যায়নি, তাই আরও চারদিনের রিমান্ড প্রয়োজন।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী তৌহিদুল ইসলাম সজীব রিমান্ড বাতিল চেয়ে শুনানি করেন। তিনি যুক্তি দেখান, গত দুই দফায় ১১ দিনের রিমান্ডে তদন্ত কর্মকর্তা কী পেলেন তা আজকের রিমান্ড আবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়নি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ৭২ বছর বয়সী হার্টে রিং পরানো এই অসুস্থ ব্যক্তিকে বারবার হয়রানি করার জন্য রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ গোলাম মুর্তজা ইবনে ইসলাম আসামিপক্ষের বিরোধিতা করে সর্বোচ্চ রিমান্ড চান। তিনি আদালতে বলেন, এ আসামি ১/১১ এর কুশীলবদের মধ্যে অন্যতম এবং আওয়ামী আমলে পুরস্কার হিসেবে ফেনী-৩ আসনের এমপি হয়েছেন। এরপরেও টাকার লোভে এজেন্সিকে তোয়াক্কা না করে ১০৩ সদস্যের সিন্ডিকেট করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আসামির তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন, যা রাষ্ট্রপক্ষের চাওয়া চারদিনের চেয়ে কম কিন্তু আসামিপক্ষের বাতিল আবেদনকে প্রত্যাখ্যান করে।
মামলার পটভূমি ও পূর্ববর্তী ঘটনাপ্রবাহ
এরআগে গত ২৩ মার্চ দিবাগত রাতে রাজধানীর বারিধারা এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। পরদিন আদালত আসামির পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে গত ২৯ মার্চ তাকে আবার ছয়দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়।
সিন্ডিকেট করে অর্থ আত্মসাৎ ও মানবপাচারের অভিযোগে গত ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর পল্টন থানায় মামলা করেন আফিয়া ওভারসিজের প্রোপাইটর আলতাব খান। মামলায় সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমেদ, সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন, সাবেক সংসদ সদস্য ও এম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী (অব.), আহমেদ ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটর ও সাবেক এমপি বেনজীর আহমেদ এবং ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটর মো. রুহুল আমীন স্বপনসহ ১০৩ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ
মামলার অভিযোগে বলা হয়, জনশক্তি রপ্তানিতে দুই হাজারের বেশি রিক্রুটিং এজেন্ট থাকলেও মামলার আসামিরা মাফিয়া সিন্ডিকেট চক্র গঠন করে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করে সংবিধানের মূলনীতি পরিপন্থি জঘন্য অপরাধ করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন সরকারি চাকরি করা অবস্থায় নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছেলেকে সিন্ডিকেট চক্রের সদস্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
আর সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমেদ তার পরিবারের সদস্য অর্থাৎ তার স্ত্রীর বড় ভাইয়ের ছেলেকে বিধিবর্হিভূতভাবে একটি প্রবাসী নামক অ্যাপস চালু করার অনুমোদন দিয়ে চক্রকে সহযোগিতা করেছে। পরস্পর যোগসাজশে মামলার বাদীর সরলতার সুযোগে ভয়ভীতি ও বলপ্রয়োগ করে মানবপাচারের উদ্দেশ্যে তার কাছ থেকে জোর করে অতিরিক্ত চাঁদা হিসেবে প্রত্যেকের দেড় লাখ টাকা হারে ৮৪১ জনের ১২ কোটি ৫৬ লাখ এক হাজার টাকা আদায় করেছে।
এছাড়া তারা সঙ্ঘবদ্ধভাবে অন্যান্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে তা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই মামলাটি দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতের দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট চক্রের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।



