সাংবাদিক দম্পতি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা আবারও পেছাল, ১২৫তম বারের মতো স্থগিত
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা আরও একবার পেছানো হয়েছে। গতকাল বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে এই মামলার জন্য নতুন তারিখ ধার্য করা হয়েছে আগামী ৭ মে। এ নিয়ে মোট ১২৫ বার প্রতিবেদন দাখিলের দিন পেছানো হলো, যা দীর্ঘদিন ধরে চলা এই বিচার প্রক্রিয়ার একটি উদ্বেগজনক দিক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
তদন্ত কর্মকর্তার আদালতে হাজিরা ও ব্যাখ্যা
গতকাল ধার্য তারিখে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে না পারার কারণ ব্যাখ্যা করতে সশরীরে আদালতে হাজির হন তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আজিজুল হক। তিনি আদালতকে দুই পাতার একটি লিখিত ব্যাখ্যা জমা দেন, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই মামলা নিয়ে গঠিত টাস্কফোর্সে তদন্ত কর্মকর্তা ছাড়াও আরও সদস্য রয়েছেন। এই জটিল কাঠামোর কারণে প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে বলে তিনি জানান। তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে আশ্বস্ত করেছেন যে আগামী ধার্য তারিখ ৭ মে-এর মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
মামলার পটভূমি ও তদন্তের ইতিহাস
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। নিহত রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় এই হত্যা মামলাটি দায়ের করেন। মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম ওরফে অরুণ, আবু সাঈদ, সাগর-রুনির বাড়ির দুই নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল ও এনায়েত আহমেদ এবং তাদের 'বন্ধু' তানভীর রহমান খান। বর্তমানে তানভীর জামিনে রয়েছেন, পলাশ রুদ্র পাল জামিনে গিয়ে পলাতক হয়েছেন এবং বাকি আসামিরা কারাগারে আটক আছেন।
প্রথমে এই মামলার তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন শেরেবাংলা নগর থানার একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই)। তবে মাত্র চারদিন পর এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিবি দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে তদন্ত করলেও রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে হাইকোর্টের নির্দেশে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হত্যা মামলাটির তদন্তভার র্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
টাস্কফোর্স গঠন ও বর্তমান অবস্থা
গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট মামলার তদন্তের দায়িত্ব থেকে র্যাবকে বাদ দিয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেয়। এই টাস্কফোর্সে বিভিন্ন বাহিনীর অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তাদের সমন্বয় রাখা হয় এবং তদন্ত কাজ শেষ করতে ছয় মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর ১৭ অক্টোবর হাইকোর্টের নির্দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে টাস্কফোর্স গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। পিবিআই প্রধানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের এই উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স কমিটি বর্তমানে কাজ করছে, যা তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।
এদিকে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন না দেওয়ায় তদন্তকর্তাকে ব্যাখ্যা দিতে আদালত নির্দেশ দিয়েছিল। গতকালের আদালত শুনানিতে তদন্ত কর্মকর্তা সেই নির্দেশ মেনে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, কিন্তু প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও বিলম্বের ঘটনা ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বাধার সৃষ্টি করছে বলে পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।



