আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিতর্কের নতুন অধ্যায়: সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব ও দুর্নীতির অভিযোগ
জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে সম্প্রতি পুনর্গঠন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও এর প্রসিকিউশন বিভাগ। তবে, এই ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও উচ্চপদস্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিচার করতে গিয়ে একের পর এক বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। পূর্ববর্তী বিতর্কের অবসান ঘটাতে গঠিত তদন্ত কমিটির কাজেও বাধার সৃষ্টি হয়েছে সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব হওয়ার মাধ্যমে। এছাড়াও কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভ পরিবর্তনের তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
প্রসিকিউটরের রুমে টাকার ব্যাগ: আশুলিয়া মামলায় নতুন অভিযোগ
বিভিন্ন বিতর্কের মধ্যে আশুলিয়ায় ৬ লাশ পোড়ানো মামলার আসামি আফজালুলের পরিবারের এক সদস্য টাকার ব্যাগ নিয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিমের রুমে প্রবেশ করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মজার বিষয় হলো, এই অভিযোগটি উত্থাপন করেছেন একই প্রসিকিউশন টিমের অন্যতম সদস্য প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদ। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন সদস্যদের ব্যাপক দুর্নীতির তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর গত ১০ মার্চ ট্রাইব্যুনালে নতুন করে নিয়োগপ্রাপ্ত চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম পাঁচ সদস্যের একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করেন।
এই কমিটির দায়িত্ব ছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের পর, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত的所有 বিষয় খতিয়ে দেখা, যার মধ্যে সাবেক প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে জামিন করিয়ে দেওয়ার অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত। তদন্ত কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় আশুলিয়ায় ৬ লাশ পোড়ানো মামলার প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিমের বিরুদ্ধেও অপরাধীদের পরিবারের সদস্যদের থেকে টাকার ব্যাগ নেওয়ার প্রসঙ্গ উঠে আসে, যা পুরো ঘটনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব: তদন্তে বড় বাধা
সেদিন আসলে কী ঘটেছিল তা যাচাই করতে ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবরের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করতে যান প্রসিকিউশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাসুদ রানা। কিন্তু তিনি হতবাক হয়ে দেখতে পান, নির্দিষ্ট ওই দিনের ভিডিও হার্ডড্রাইভে অনুপস্থিত। এই হার্ডড্রাইভ গায়েব হওয়া নিয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে নতুন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে, যা তদন্ত প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
বিষয়টি নিয়ে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, “গত বছরের ১৩ অক্টোবর সিসি ক্যামেরা থেকে গায়েব হওয়া ফুটেজ তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমেও উদ্ধার করা যায়নি। প্রাথমিক অবস্থায় আমরা জানতে পেরেছি, সিসলগগুলোতে যে হার্ডড্রাইভগুলো থাকার কথা ছিল, সেখানে পুরনো-নতুন কিছু হার্ডড্রাইভ রিপ্লেস হয়েছে। সিসলগ এবং রেজিস্ট্রার খাতাতেও আমরা প্রাথমিক অবস্থায় বিষয়টি দেখতে পেয়েছি।”
ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটিকে বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে জানিয়ে জোহা আরও বলেন, “এটা তদন্তাধীন বিষয়। আমরা ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটিকে বিষয়টি জানিয়েছি। মন্ত্রণালয়ের আদেশ অনুযায়ী ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে এবং সুপারিশ করবে। সুতরাং, আমি এ বিষয়ে অগ্রিম মন্তব্য করতে পারছি না।” এ ঘটনায় থানায় কোনও জিডি করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কোনো জিডির তথ্য আমার কাছে এই মুহূর্তে জানা নেই।”
প্রসিকিউটরদের মধ্যে মতবিরোধ: তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তি
প্রসিকিউটর জোহার বক্তব্যে বাধ সাধলেন আরেক প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “ট্রাইব্যুনালের সিসিটিভি ফুটেজ থাকা না থাকার বিষয়ে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি এখনও কোনও কাজ শুরু করে নাই। কমিটির পক্ষ থেকে প্রসিকিউটর জোহাকেও এ বিষয়ে কোনও দায়িত্বও দেওয়া হয়নি। তিনি ও এ বিষয়ে কমিটিকে কিছু জানাননি। অতএব, সিসিটিভি ফুটেজ থাকা না থাকার বিষয়ে দেওয়া বক্তব্য তার ব্যক্তিগত। অনুসন্ধান চলাকালে এ ধরনের বক্তব্য অনভিপ্রেত।”
এই মতবিরোধ পুরো তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও জটিল ও বিভ্রান্তিমূলক করে তুলছে। তবে, সব বিষয় নিয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে এবং তদন্তে সব তথ্য উঠে আসবে বলে আশ্বস্ত করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠনের মাধ্যমে দুর্নীতি ও অনিয়মের সকল অভিযোগের তদন্ত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে, যা দেশের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।



