বগুড়ার গাবতলীতে কৃষক লতিফ হত্যার রহস্য উন্মোচিত, জমি বিরোধে প্রতিবেশী গ্রেফতার
বগুড়ায় কৃষক হত্যার রহস্য উন্মোচিত, প্রতিবেশী গ্রেফতার

বগুড়ার গাবতলীতে কৃষক হত্যার রহস্য উন্মোচিত: জমি বিরোধে প্রতিবেশী গ্রেফতার

বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। কৃষক আবদুল লতিফ আকন্দ (৬৫) হত্যার ঘটনায় তার প্রতিবেশী গৌরব সিংহ (৩৩) গ্রেফতার হয়েছেন এবং আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জমি থেকে শ্যালোমেশিন সরিয়ে না নেওয়ার বিরোধে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ

গত ২৯ মার্চ সকালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের নিশিন্দারা হিন্দুপাড়ায় কৃষক আবদুল লতিফ আকন্দের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি নিজ শ্যালোমেশিন ঘরের পাশে ধানখেতে পড়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া যান। লতিফ আকন্দ ওই গ্রামের মৃত মোবারক আলী আকন্দের ছেলে ছিলেন। মরদেহ উদ্ধারের পর গাবতলী থানায় অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয় এবং তদন্তের দায়িত্ব পান থানার এসআই রিপন বর্মণ।

তদন্তের একপর্যায়ে একই গ্রামের জ্ঞানেন্দ্র নাথ সিংহের ছেলে গৌরব সিংহকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গৌরব সিংহ জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলা এলাকায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নিরাপত্তা কর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গোপনে তথ্য পেয়ে পুলিশ গত ৩০ মার্চ বিকালে তাকে গ্রেফতার করে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি লতিফ আকন্দকে হত্যার দায় স্বীকার করেন এবং ঘটনার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হত্যার পেছনের কারণ ও স্বীকারোক্তি

গৌরব সিংহের বক্তব্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর আগে লতিফ আকন্দ তার বাবা জ্ঞানেন্দ্র নাথ সিংহের কাছে পাঁচ লাখ টাকায় একটি সেচ পাম্পের জমি ক্রয় করেন। তবে জমির দলিল না দেওয়ায় প্রায় দুই মাস আগে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে লতিফকে টাকা ফেরত দেওয়া হয়। এরপর জমি থেকে সেচপাম্প তুলে নিতে বলা হলে লতিফ আকন্দ তা না করায় গৌরব সিংহ ক্ষিপ্ত হন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এছাড়া, গত ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে লতিফ আকন্দ গৌরব সিংহকে মারপিট করায় তার মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরপর গৌরব সিংহ লতিফকে হত্যার পরিকল্পনা করেন এবং বেশ কয়েকবার মোবাইল ফোনে ও প্রকাশ্যে তাকে হত্যার হুমকি দেন। এই হুমকির একটি অডিও রেকর্ডও পুলিশের হাতে রয়েছে বলে জানা গেছে।

হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা ও প্রমাণ

গৌরব সিংহ তার স্বীকারোক্তিতে জানান, তিনি গত ২৮ মার্চ রাত ১০টা ২৩ মিনিটে কর্মস্থল জামালপুর থেকে গাবতলীর নিশিন্দারা গ্রামে আসেন। রাত ৩টার দিকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যায়। ২৯ মার্চ বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তিনি পুনরায় জামালপুরে ফিরে যান, তবে তার গ্রামে আসার কথা স্বজনরা অস্বীকার করেন।

ঘটনাস্থলের পাশে একটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়, এবং এক সিএনজি অটোরিকশাচালক গ্রামের বটগাছের নিচে রূপালী ব্যাংকের একটি ক্রেডিট কার্ড পান। পরবর্তীতে যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এই মোবাইল ফোন ও ক্রেডিট কার্ডের মালিক গৌরব সিংহ।

গৌরব সিংহ আরও উল্লেখ করেন যে, তিনি ঘটনার রাতে সেচপাম্পের কাছে গিয়ে লতিফ আকন্দকে একা পেয়ে বিছানা থেকে টেনে তুলে মারপিট শুরু করেন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সেখানে থাকা একটি কোদাল দিয়ে তিনি লতিফের মাথায় আঘাত করেন, যার ফলে লতিফ গুরুতর রক্তাক্ত হন। এরপর তাকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে জমিতে এনে হাতে ও পায়ে আঘাত করে হাড় ভেঙে ফেলা হয়। লতিফের মৃত্যু নিশ্চিত করে গৌরব সিংহ রাতেই জামালপুরে চলে যান।

আদালতে স্বীকারোক্তি ও আইনি প্রক্রিয়া

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিকালে তদন্তকারী এসআই রিপন বর্মণ গৌরব সিংহকে বগুড়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করলে তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। গাবতলী থানার ওসি রাকিব হোসেন একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এই হত্যাকাণ্ড স্থানীয় সম্প্রদায়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং পুলিশের দ্রুত তদন্ত ও গ্রেফতারের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা প্রশংসিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের সহিংসতা রোধে সামাজিক সচেতনতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।