জেআইসিতে গুমের মামলায় সাক্ষীর জবানবন্দি: ডিজিএফআইয়ের ভূমিকা নিয়ে নতুন তথ্য
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ সোমবার জেআইসিতে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষী ইকবাল চৌধুরীকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জেরা করেন। এই জেরায় তিনি তাঁর বন্দী অবস্থার বিস্তারিত বিবরণ দেন, যা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) কার্যক্রম নিয়ে নতুন আলোকপাত করে।
বন্দী অবস্থার স্থান নিয়ে বিভ্রান্তি ও নিশ্চিতকরণ
ইকবাল চৌধুরী তাঁর জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, ২০১৮ সালের ৭ মে তাঁকে মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয় এবং ২০১৯ সালের ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত আটক রাখা হয়। বন্দী থাকাকালীন তিনি অনুমান করেছিলেন যে তিনি রাজধানীর কাফরুলে অবস্থিত ডিজিএফআইয়ের সদর দপ্তরে আছেন। তবে পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমানের সঙ্গে মেসেঞ্জারে কথোপকথনে তিনি নিশ্চিত হন যে তিনি আসলে ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) আটক ছিলেন।
জেরার সময় ইকবাল চৌধুরী আরও বলেন, বন্দী অবস্থায় তিনি হাসিনুর রহমানকে দেখেছিলেন, যা পূর্বের জবানবন্দিতেও উল্লেখ করা হয়েছিল। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘দুপুরে গোসলের পরে বাথরুম থেকে বের হওয়ার সময় আমার পূর্বপরিচিত লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমানকে দেখতে পাই।’ এই সাক্ষ্যটি মামলার প্রমাণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ব্যবসা ও আত্মগোপনের বিষয়ে স্পষ্টতা
আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জেরায় ইকবাল চৌধুরী তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কিছু দিকও তুলে ধরেন। তিনি স্বীকার করেন যে তাঁর ব্যবসা যখন মন্দা যেত, তখন তিনি বিষয়টি পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করতেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ কথা সত্য নয় যে ব্যবসা মন্দা অবস্থায় তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। এই দাবিটি মামলার প্রাসঙ্গিকতা বুঝতে সহায়তা করে।
মামলার আসামিদের অবস্থা
এই মামলায় মোট ১৩ জন আসামি রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩ জন বর্তমানে গ্রেপ্তার অবস্থায় আছেন। গ্রেপ্তার আসামিরা হলেন:
- মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন (ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক)
- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী (ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক)
- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী (ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক)
সোমবার এই তিনজনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। অন্যদিকে, বাকি ১০ জন আসামি পলাতক রয়েছেন। পলাতক আসামিদের তালিকায় ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালকসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আছেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
- লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আকবর হোসেন
- মেজর জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদিন
- লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) সাইফুল আলম
- লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী
- মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক
এছাড়াও পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ, এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক। মামলার তদন্তে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকও পলাতক আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন।
মামলার প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য
এই মামলাটি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জেআইসিতে গুম করে রাখার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা হয়েছে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্তর্ভুক্ত। সাক্ষী ইকবাল চৌধুরীর জবানবন্দি এবং জেরা মামলার সত্যতা যাচাই ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ট্রাইব্যুনালে চলমান এই মামলা বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে।



