সংবাদ সম্মেলনে শিশির মনিরের সতর্কতা: সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকার জাতির জন্য ক্ষতিকর
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মোহাম্মদ শিশির মনির আজ সোমবার দুপুরে হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবনের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা যদি কারও থাকে, তারা যদি যুক্তির চাইতে অহংকার আর শক্তি প্রদর্শন করেন—এটা শেষ পর্যন্ত জাতিগতভাবে ভালো কোনো ফল দেয় না। আমরা সবাই এর প্রমাণ।’
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশের পর্যালোচনা
সংবাদ সম্মেলনে শিশির মনির অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, এই অধ্যাদেশগুলো জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে:
- ১২টি অধ্যাদেশকে ল্যাপস বা কার্যকারিতা নেই বলে প্রস্তাব করা হয়েছে।
- ৩টি অধ্যাদেশ বাতিল করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
- ১৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে নতুন করে ফর্মুলেট করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
- ৭৪টি অধ্যাদেশকে পাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
- ৩১টি অধ্যাদেশ সংশোধন সাপেক্ষে পরবর্তী সময়ে সংসদে উত্থাপন করার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন যে সরকার বড় সংস্কার প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো ল্যাপস করে দিচ্ছে।
গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের আইনি জটিলতা
গণভোট অধ্যাদেশ সম্পর্কে শিশির মনির সতর্ক করে বলেন, ‘গণভোট অধ্যাদেশকে ইনফ্রাকচুয়াস হিসেবে ল্যাপস করার প্রস্তাব করা হয়েছে, অর্থাৎ এর আর কোনো কার্যকারিতা নেই বলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে—এই ধারণা সঠিক নয়।’
তিনি ব্যাখ্যা করেন, গণভোট অধ্যাদেশের সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ৬ ধারা, নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত নির্বাচন তফসিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই বিষয়গুলো এতটাই ইন্টারলিংক যে একটিকে আলাদা করলে অন্যটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, ‘এগুলো অবিভাজ্য ও অবিভক্ত। সবকিছু একসঙ্গে সুরাহা করতে হবে, অন্যথায় আইনি বিশৃঙ্খলা এবং জটিলতা দেখা দেবে।’
গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ সংরক্ষণের আহ্বান
শিশির মনির সংবাদ সম্মেলনে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ এবং ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক অধ্যাদেশগুলোর দিক তুলে ধরেন।
তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের উদ্বেগ হলো, সরকারকে এই ধরনের দ্রুত ও অসতর্ক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এগুলো করা উচিত নয়। বরং স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে উপযুক্ত সমাধান বের করা উচিত। অন্যথায় দেশ অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হবে।’
শিশির মনির আরও যোগ করেন, ‘সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেসব অধ্যাদেশের মাধ্যমে বড় সংস্কার করা হয়েছে, সেগুলো দয়া করে ল্যাপস করবেন না। বিশেষ করে গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন, সুপ্রিম কোর্ট সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ, ব্যাংক রেজোল্যুশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধন অধ্যাদেশ।’
তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘এই অধ্যাদেশগুলো যদি বাতিল করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রকে সংস্কার আকারে উপস্থাপনের যে স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, তা নষ্ট হয়ে যাবে। জনগণ হতাশ হবে এবং আশা হারাবে। আমাদের আশার প্রয়োজন।’
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিতি
এই সংবাদ সম্মেলনে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সহসম্পাদক ও জামায়াতের ঢাকা মহানগরীর মজলিশে শুরা সদস্য মো. সাইফুর রহমান, আইনজীবী পারভেজ হোসেন ও সাদ্দাম হোসাইন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। তাদের উপস্থিতি এই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
শিশির মনিরের এই বক্তব্য রাজনৈতিক ও আইনি মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।



