সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হককে জুলাই আন্দোলনের দুটি হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখাল আদালত
সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হককে হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো

সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হককে জুলাই আন্দোলনের দুটি হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখাল আদালত

জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও আদাবর থানায় পৃথক দুই হত্যা মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। সোমবার (৩০ মার্চ) পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জামসেদ আলমের আদালত এই আদেশ দেন।

মামলার পটভূমি ও আবেদন

যাত্রাবাড়ী থানার এলাকায় শিক্ষার্থী মো. আরিফ হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের উপপরিদর্শক মো. মাহমুদুল হাসান গত ১০ মার্চ খায়রুল হককে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করেন। অন্যদিকে, আদাবর থানা এলাকায় গার্মেন্টসকর্মী রুবেল হত্যা মামলায় পুলিশের উপপরিদর্শক মোহাম্মদ টিপু সুলতান একই আবেদন করেন গত ২৯ এপ্রিল। আদালত উভয় আবেদন আসামির উপস্থিতিতে শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করেন।

আদালতের কার্যক্রম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

সেদিন সকাল সাড়ে ৯টায় খায়রুল হককে সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। পৌনে ১২টায় পুলিশের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে তাকে আদালতে উঠানো হয়। শুনানিকালে তিনি নিশ্চুপভাবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রথমে রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী গ্রেফতার দেখানোর পক্ষে শুনানি করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাষ্ট্রপক্ষ ও প্রতিবাদী পক্ষের যুক্তি

রাষ্ট্রপক্ষের পিপি ওমর ফারুক ফারুকী শুনানিতে বলেন, এবিএম খায়রুল হক এসব মামলায় এজাহারনামীয় আসামি। প্রধান বিচারপতি হয়ে তিনি দলীয়করণ করে ফ্যাস্টিস শেখ হাসিনাকে সহযোগিতা করেছেন। পঞ্চম সংশোধনী সংবিধানে সব বাদ দিয়ে দিয়েছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে শেখ হাসিনা ফ্যাস্টিস তৈরি করেছেন। শেখ হাসিনাকে ফ্যাস্টিস বানানোর মূল কারিগর এই আসামি; যার কারণে মানুষ তার ভোটার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফ্যাস্টিস সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে অনেক মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। এসব কারণে সরকার তাকে সব সুযোগ-সুবিধা দেয়। মামলার তদন্ত স্বার্থে আসামিকে এসব মামলায় গ্রেফতার দেখানো একান্ত প্রয়োজন।

খায়রুল হকের পক্ষে তার আইনজীবী মোনায়েম নবী শাহিন এর বিরোধিতা করে শুনানি করেন। তিনি বলেন, আসামি একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি। তিনি জুডিশিয়াল মব সন্ত্রাসীর স্বীকার। একই ঘটনায় তিনটি মামলা দিয়ে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। গত ৫ মার্চ পাঁচ মামলায় তিনি জামিন পান। জামিন পাওয়ার পরপরই তাকে আরও দুই হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে। আসামি জামিন পাওয়ার পরও তাকে অন্য মামলায় কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। আসামির ৮১ বছর বয়স। প্রায় এক বছর ধরে তিনি জেলহাজতে আটক রয়েছেন। গ্রেফতার দেখানোর বিরোধিতা করে তার জামিনের প্রার্থনা করছি।

আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক বলেন, এই আদালতে জামিন বিষয়ে শুনানি হবে না। শুধু গ্রেফতার সংক্রান্ত শুনানি হয়েছে। আপনার জামিন সংক্রান্ত শুনানি নথিভুক্ত করা হলো। আর আসামিকে এসব মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলো। এরপর আদালত পৃথক দুটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।

হত্যা মামলার বিস্তারিত অভিযোগ

আরিফ হত্যা মামলার অভিযোগে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকালে যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকার বউবাজার রোডে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। সে সময় লর্ড হার্ডিঞ্জ সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের ছাত্র মো. আরিফের চোখে গুলি লাগে। চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট আরিফের বাবা মো. ইউসুফ যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেন।

রুবেল হত্যা মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রুবেলসহ কয়েকশ ছাত্র-জনতা সকাল ১১টার দিকে আদাবর থানার রিংরোড এলাকায় প্রতিবাদী মিছিল বের করে। এ সময় পুলিশ, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ, তাঁতীলীগ, কৃষকলীগ, মৎসজীবী লীগের নেতাকর্মীরা গুলি চালায়। এতে রুবেল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান তিনি। এ ঘটনায় ২২ আগস্ট আদাবর থানায় মামলাটি করেন রুবেলের বাবা রফিকুল ইসলাম।

পূর্ববর্তী গ্রেফতার ও বর্তমান অবস্থা

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৪ জুলাই বিচারপতি খায়রুল হককে রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর পর থেকে তিনি কারাগারে আটক রয়েছেন। এই নতুন গ্রেফতার দেখানো তার আইনি অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন।