বিচারকের সিল-স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা পাঠানোর সংঘবদ্ধ চক্র উন্মোচিত
যুগান্তরের কয়েক মাসব্যাপী অনুসন্ধানে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরীহ মানুষের নামে পাঠানো হচ্ছে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এই অপকর্ম চালাচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। চক্রটির সঙ্গে জড়িত রয়েছে কতিপয় পুলিশ ও আইনজীবী, পাশাপাশি আদালত ও কারাগারের অসাধু কর্মচারীরা।
কীভাবে কাজ করে চক্রটি?
অনুসন্ধানে জানা যায়, চক্রটি প্রথমে বিচারকের স্বাক্ষর ও সিল জাল করে আসামিদের নামে ভুয়া কাস্টডি ওয়ারেন্ট তৈরি করে। পরিকল্পিতভাবে নিজেদের সুবিধামতো তারিখ বসিয়ে ওই ভুয়া ওয়ারেন্ট কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে থাকা চক্রের সহযোগীরা সেটিকে ওয়ারেন্ট তালিকায় এন্ট্রি করে। ফলে নথি অনুযায়ী নির্ধারিত দিনে আসামিকে আদালতে পাঠানো হয়।
কিন্তু আদালত কক্ষে হাজির করার পরিবর্তে চক্রের সদস্যরা তাকে আদালত ভবনের অন্যত্র নিয়ে যায়। এরপর সুবিধামতো কোনো কক্ষ বা নির্দিষ্ট স্থানে রেখে আসামিকে নানা ধরনের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে আইনজীবীর সঙ্গে বৈঠক, খাওয়াদাওয়া, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা এমনকি গোপনে বৈঠক করার সুযোগও।
সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছে প্রমাণ
এ ধরনের ঘটনার তথ্যপ্রমাণ ও সিসিটিভি ফুটেজ যুগান্তরের হাতে এসেছে। এক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, আসামিকে আদালতে হাজিরার কথা বলে হাজতখানা থেকে বের করে আদালত ভবনের ১০ তলার রেকর্ড রুমে নিয়ে ওইসব সুবিধা দেওয়া হয়েছে। মজার বিষয় হলো, একই আসামিকে টানা চারদিন একই কৌশলে আদালতে এনে একই কক্ষে নেওয়া হয়েছে। অথচ ওই চার দিনের কোনোদিনই আসামির আদালতে হাজিরার নির্ধারিত তারিখ ছিল না। অর্থাৎ সম্পূর্ণ ভুয়া ওয়ারেন্টের ভিত্তিতেই তাকে কারাগার থেকে বের করা হয়েছিল।
টাকার বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এসব সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে চক্রটি আসামি বা তাদের স্বজনদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে। মামলার ধরন, আসামির প্রভাব ও সুবিধার মাত্রা অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাসিন্দা ওয়াসিমের নামে হঠাৎ করেই একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা যায় স্থানীয় থানায়। পরোয়ানায় উল্লেখ করা হয়, ঢাকার কলাবাগান থানায় করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় তিনি আসামি।
বিষয়টি জানতে পেরে ওয়াসিম ঢাকায় এসে আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগে খোঁজ নেন আদৌ তার বিরুদ্ধে এমন কোনো মামলা আছে কি না। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তার নামে জারি হওয়া পরোয়ানাটি সম্পূর্ণ ভুয়া। শুধু ওয়াসিমই নন, যুগান্তরের হাতে এমন আরও ৮টি জাল পরোয়ানার কপি এসেছে। সবই চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়েছিল।
জাল পরোয়ানা তৈরির নিখুঁত পদ্ধতি
জানা যায়, চক্রটি হুবহু আদালতের আসল পরোয়ানার আদলে জাল গ্রেফতারি পরোয়ানা তৈরি করে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে কৌশলে পাঠিয়ে দেয়। ভুয়া ওয়ারেন্টগুলো পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সেগুলো দেখতে প্রায় অবিকল আসল পরোয়ানার মতো। পরোয়ানায় সংশ্লিষ্ট আদালতের ফরম্যাট, মামলার তথ্য এবং বিচারকের স্বাক্ষরও রয়েছে।
সূত্র জানায়, এত নিখুঁতভাবে আদালতের ফরম্যাট ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ভুয়া পরোয়ানা তৈরি করা সাধারণ কারও পক্ষে সম্ভব নয়। যারা আদালতের নথিপত্র, পরোয়ানা ইস্যুর পদ্ধতি এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি জানেন, তারাই এমন জাল নথি তৈরি করতে পারেন। এ চক্রের সঙ্গে আদালতের কিছু অসাধু পেশকার, উমেদার এবং পুলিশের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা জড়িত। তাদের যোগসাজশেই এসব জাল পরোয়ানা তৈরি এবং বিভিন্ন স্থানে পাঠানোর ঘটনা ঘটছে।
আইনজীবী ও কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, "যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত। এ ধরনের অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন দুঃসাহস দেখাতে না পারে।" তিনি আরও বলেন, এতে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে। এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাজ, তাই জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী যুগান্তরকে বলেন, "আমরা এখন পর্যন্ত এ ধরনের অভিযোগ পাইনি। যদি এমন কোনো ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব।"
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, "যে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন, সে ধরনের কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা তা গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখব। তদন্তে কারও দায়দায়িত্ব প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
এই ঘটনা বিচারব্যবস্থার নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। সাধারণ মানুষের আস্থা রক্ষায় দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।



