কিশোর গ্যাংয়ের দাপটে দেশজুড়ে অপরাধের মহামারি
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সারা দেশের গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও খুনসহ নানা ধরনের অপরাধ বেড়েই চলেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে এবং গ্রেফতারের সংখ্যাও বাড়ছে। শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও কিশোর অপরাধ এখন মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে, যা জাতির ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির কারণ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েক বছর আগেও কিশোরদের মধ্যে এত নৃশংস অপরাধ প্রবণতা কম ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তির বিস্তার, স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরাও অসহায় হয়ে পড়েছেন, এমনকি প্রতিবাদ করতে গিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটছে। কিশোর আইনের নমনীয়তার কারণে অনেক অভিযুক্ত দ্রুত জামিনে বের হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়াচ্ছে, যা নতুন করে আইন সংশোধনের দাবি জোরালো করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “গুরুতর অপরাধে হাতেনাতে গ্রেফতারের পরও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এসব কিশোর দুর্বৃত্তদের আবার এলাকায় বুক ফুলিয়ে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। এতে এই চক্রের মধ্যে দায়মুক্তির একটা মানসিকতা তৈরি হয়ে যায়।” তিনি আরো উল্লেখ করেন, রাজধানীর প্রতিটি পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঘটেছে।
পুলিশের অভিযান ও গ্রেফতার
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান জানান, এক মাসে সহস্রাধিক কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বছিলা, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় এদের তত্পরতা বেশি। এছাড়া মিরপুর, পল্লবী, উত্তরা, বাড্ডা, ভাটারা, শাহজাহানপুর, রামপুরা, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, পুরাতন ঢাকা, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, শ্যামপুর, সূত্রাপুর এলাকার মানুষও কিশোর গ্যাংয়ের অত্যাচারে অতিষ্ঠ।
ঢাকা মহানগর ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কমিশনার মো. সারওয়ার বলেন, “রাজধানীর সব থানায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। গ্যাং সদস্যদের পাশাপাশি পৃষ্ঠপোষকদেরও তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।” নতুন সরকার অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
দেশব্যাপী ভয়াবহ পরিস্থিতি
মাঠপর্যায়ের সংবাদদাতাদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি ময়মনসিংহে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। জেলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১১১টি খুন ও ৬০টি ছিনতাই মামলায় ৪৬৭ জন গ্রেফতার হয়েছে। ঝিনাইদহে ছয় মাসে ৩৩ মামলায় ৮৫ জন গ্রেফতার হয়েছে, যার অধিকাংশই কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সেখানে প্রায় ২০০ সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ে প্রায় ১৪০০ সদস্য রয়েছে। গত ছয় মাসে ৫৪৮টি অপরাধে তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে এবং ৬৪ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির পৃষ্ঠপোষকতার তথ্য মিলেছে। একই চিত্র দেশের অন্য জেলাগুলোতেও দেখা যাচ্ছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতামত
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, “কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। পাড়া-মহল্লায় বাসিন্দারা এদের দাপটে অতিষ্ঠ। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, খুন, মাদক সেবন সব অপরাধেই কিশোর গ্যাং জড়িত। তাদের হাতে চাপাতি, লাঠি ও অস্ত্র। অথচ তাদের হাতে থাকার কথা ছিল স্কুলের বই।” তিনি আরো যোগ করেন, মাদকাসক্ত কিশোরদের চিকিত্সা দিয়ে কিছুদিন সুস্থ রাখার পর আবার কিশোর গ্যাংয়ে যুক্ত হয়ে মাদক সেবন শুরু করে, যা জাতির জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রায়হানুল ইসলাম বলেন, “কিশোর গ্যাং নতুন নয়, কিন্তু কীভাবে এই ‘ক্যানসার’ থেকে জাতি মুক্তি পাবে সেটা নিয়ে সবার অংশগ্রহণে মহাপরিকল্পনা করতে হবে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাদের এগিয়ে আসতে হবে এবং এসব কিশোর অপরাধীদের কোনো দলে পদ পদবির প্রলোভন দেওয়া যাবে না।”
সমাজ বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে অপরাধ সারা দেশে বাড়ছে। সমাজের সুবিধা বঞ্চিত পরিবারের কিশোররা অধিক মাত্রায় অপরাধ প্রবণতায় জড়িয়ে পড়ছে। এই কিশোরদের একটি অংশকে সমাজের স্বার্থান্বেষী মহল একত্রিত করে কিশোর গ্যাং তৈরি করে নানা অপরাধে ব্যবহার করছে।” তিনি আরো উল্লেখ করেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেও যথাযথ প্রতিরোধ সম্ভব হচ্ছে না, তাই আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং আইন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আছে।
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ব্যাপক হারে দেশে মাদক প্রবেশ করছে এবং মাদকের ছোবলে জাতি ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মাদক প্রবেশ বন্ধ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব বলে তিনি জানান।
সরকারের পক্ষ থেকে অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের নির্দেশনায় দেশব্যাপী তালিকা প্রণয়ন ও অভিযান জোরদার হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান। তিনি আরো বলেন, রাজধানীর বস্তি এলাকাগুলো চিহ্নিত করে বাসিন্দাদের তালিকা করা হচ্ছে এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা বাস্তবায়ন হলে অপরাধ কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।



