ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল: আইন, সাংবাদিকতা ও কূটনীতির পথ ধরে অ্যাটর্নি জেনারেল পদে
রুহুল কুদ্দুস কাজল: আইনজীবী থেকে অ্যাটর্নি জেনারেল

ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল: আইন, সাংবাদিকতা ও কূটনীতির পথ ধরে অ্যাটর্নি জেনারেল পদে

বাংলাদেশের ১৮তম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস (কাজল)। আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর অনুবিভাগ বুধবার (২৫ মার্চ) তাকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। সংবিধানের ৬৪(১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি তাকে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই পদে নিয়োগ প্রদান করেছেন। প্রজ্ঞাপন জারির পর একইদিন বিকালে তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

দায়িত্ব গ্রহণে প্রতিক্রিয়া ও শিক্ষাজীবন

নিয়োগের পর গণমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় ব্যারিস্টার কাজল বলেন, "আলহামদুলিল্লাহ, আমি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। তবে আমি মনে করি এটা অত্যন্ত কঠিন দায়িত্ব। আমি আল্লাহর সহযোগিতা কামনা করছি যেন দায়িত্বটা সঠিকভাবে পালন করতে পারি।" তার শিক্ষাজীবন যশোর বোর্ডে শুরু হয়, যেখানে ১৯৮৬ সালে প্রথম বিভাগে এসএসসি এবং ১৯৮৮ সালে উচ্চমাধ্যমিকে সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৮ম স্থান অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৩ সালে এলএলবি (অনার্স) এবং ১৯৯৪ সালে এলএলএম ডিগ্রি লাভ করেন।

পেশাগত যাত্রা: সাংবাদিকতা থেকে আইন

ছাত্রজীবন থেকেই সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রুহুল কুদ্দুস কাজল। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি দৈনিক দিনকাল পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। আইন পেশায় তার যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৫ সালে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী হিসেবে। ১৯৯৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে প্রাকটিসের অনুমতি পান। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন এবং ২০২৩ সালে সিনিয়র অ্যাডভোকেট হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আন্তর্জাতিক শিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি ২০০৫ সালে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে এলএলবি (অনার্স) ডিগ্রি, ২০০৬ সালে সিটি ইউনিভার্সিটি থেকে বার ভোকেশনাল কোর্স সম্পন্ন করেন এবং লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-এট-ল' সনদ অর্জন করেন।

সাংবিধানিক মামলায় দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ

ব্যারিস্টার কাজল সাংবিধানিক আইনের জটিল ব্যাখ্যায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। তিনি অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে আদালতে মতামত প্রদান করেছেন এবং তার বিশ্লেষণ জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মামলাগুলোতে তার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:

  • ষোড়শ সংশোধনী রিভিউ মামলায় তার সাবমিশন আইনজীবী মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
  • পঞ্চদশ সংশোধনী মামলা ও ড. ইউনূস সরকারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটের বিপক্ষে শুনানিতে অংশগ্রহণ।
  • ত্রয়োদশ সংশোধনী রিভিউ মামলায় বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ের আইনি ত্রুটি পর্যালোচনা উপস্থাপন।
  • বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের পক্ষে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাসহ বিভিন্ন মামলার শুনানিতে দক্ষতা প্রদর্শন।

তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারত, চীন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক কনফারেন্সে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন। আন্তর্জাতিক বার অ্যাসোসিয়েশন, কমনওয়েলথ ল’ অ্যাসোসিয়েশন এবং ল’ এশিয়ার সদস্য তিনি।

কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা

২০০৩-২০০৬ মেয়াদে তিনি বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক কর্মকর্তা হিসেবে যুক্তরাজ্যের লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশনে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনীতিতে তার সক্রিয়তা ছাত্রজীবন থেকেই শুরু, যখন তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ‘আইন সহায়তা সেল’র প্রধান হিসেবে তিনি প্রায় অর্ধশতাধিক প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে প্রফেসর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে বিএনপির প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে সংবিধান ও বিচার বিভাগ সংস্কারে মতামত প্রদান করেন।

আইনজীবী সমিতিতে নেতৃত্ব ও স্বীকৃতি

আইনপেশার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি হিসেবে তিনি সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট হয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে পরপর তিনবার (২০২০-২১, ২০২১-২২, ২০২২-২৩) সম্পাদক নির্বাচিত হন। সারাদেশের আইনজীবীদের ভোটে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হয়ে সর্বশেষ বার কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন।

সাংবিধানিক ও ফৌজদারি আইনে বিশেষ দক্ষতা, পেশাজীবীদের নেতা হিসেবে ভূমিকা এবং জাতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল একজন যোগ্য নেতা ও দক্ষ প্রশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। তার বহুমুখী পেশাগত অভিজ্ঞতা অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।