কুমিল্লায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যু: নিহতের খালার করা মামলায় দুই গেটম্যান আসামি
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় বাসের ১২ জন যাত্রী নিহতের মর্মান্তিক ঘটনায় আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। সোমবার দুপুরে শেফালী আক্তার (৫৮) নামের এক নারী কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে থানায় বাদী হয়ে এই মামলাটি করেন। মামলায় রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী মো. হেলাল ও মেহেদী হাসানকে প্রাথমিক আসামি করা হয়েছে। এছাড়াও রেলক্রসিংয়ের দায়িত্বে থাকা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অজ্ঞাতনামা হিসেবে আসামি করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর দ্রুত ব্যবস্থা ও তদন্ত
গত শনিবার গভীর রাতে সংঘটিত এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে রেলওয়ে বিভাগ ইতিমধ্যে ওই দুই গেটম্যানকে বরখাস্ত করেছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বরত গেটম্যানের দায়িত্বহীনতায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার তদন্তে তিনটি পৃথক কমিটিও গঠন করা হয়েছে। যদিও বরখাস্ত করা দুজনকে গেটম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, মামলার এজাহারে একজনকে অস্থায়ী গেটম্যান এবং অন্যজনকে ওয়েম্যান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাদী ও নিহতের পারিবারিক যোগসূত্র
মামলার বাদী শেফালী আক্তার নিজেকে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার রায়পুর গ্রামের সোহেল রানার (৪৬) খালা বলে উল্লেখ করেছেন। সোহেল রানা এই দুর্ঘটনায় নিহত ১২ জনের একজন। শেফালী আক্তার লাকসাম উপজেলার ফতেহপুর গ্রামের প্রয়াত আক্তারুজ্জামানের স্ত্রী। তার দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, সোহেল রানা মালয়েশিয়াপ্রবাসী ছিলেন এবং গত ১৫ রমজানে ছুটিতে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
দুর্ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা
ঈদের দিন শনিবার দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসকে ধাক্কা দেয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেন। এই সংঘর্ষে সাত জন পুরুষ, দুই নারী এবং তিন শিশুসহ মোট ১২ জন যাত্রী প্রাণ হারান। এছাড়াও অন্তত ১০ জন গুরুতর আহত হন, যারা সবাই ছিলেন বাসের যাত্রী।
বাদীর এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, সোহেল রানা ঈদের দিন সন্ধ্যা ৬টা ৪২ মিনিটের দিকে ঝিনাইদহের খালিশপুর বাস কাউন্টার থেকে মামুন স্পেশাল পরিবহনের বাসে করে তার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে লাকসামে বেড়াতে রওনা দেন। শনিবার রাত ৩টার একটু আগে বাসটি পদুয়া বাজার রেলক্রসিংয়ে পৌঁছালে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ঢাকা মেইল ওয়ান আপ ট্রেনের ইঞ্জিনের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। ধাক্কার ফলে বাসটি ইঞ্জিনের সঙ্গে আটকে যায় এবং ট্রেনটি ইঞ্জিনের মুখে করে বাসটিকে প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়।
আসামিদের পরিচয় ও পলাতক অবস্থা
মামলার প্রধান আসামি মো. হেলাল (৪১) কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কোদালিয়া গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে। তিনি পদুয়া বাজারের রেলওয়ে ওভারপাসের নিচে অবস্থিত রেলগেট নম্বর ই/৪৭-এর অস্থায়ী গেটম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অপর আসামি মেহেদী হাসান (৩৩) একই উপজেলার বাহিরীপাড়া এলাকার আবদুল কাদেরের ছেলে এবং তিনি ওই লেভেল ক্রসিংয়ে ওয়েম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
লাকসাম রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসীম উদ্দিন খন্দকার জানান, ১২ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে এবং লেভেল ক্রসিংয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী হেলাল ও মেহেদী হাসানকে আসামি করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে ঘটনার পর থেকে উভয় আসামি পলাতক রয়েছেন এবং তাদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ চেষ্টা চালাচ্ছে।
এই দুর্ঘটনা রেলওয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুতর ত্রুটি ও দায়িত্বহীনতার প্রশ্ন তুলেছে, যা এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পর্যালোচিত হবে।



