আইসিটি প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ: সাবেক এমপির জামিনে ১ কোটি টাকা দাবি
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) একজন প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর জামিনের জন্য ১ কোটি টাকা দাবির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রথম আলো ও নেত্র নিউজের সংগ্রহ করা হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের একাধিক অডিও রেকর্ডিংয়ে এই তথ্য পাওয়া গেছে, যা দুর্নীতির একটি জটিল কাহিনি প্রকাশ করেছে।
ঘুষ দাবির বিস্তারিত বিবরণ
রেকর্ডিংগুলোতে দেখা যায়, সাইমুম রেজা তালুকদার ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জামিনের বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি স্পষ্টভাবে ১ কোটি টাকা দাবি করেন এবং অগ্রিম হিসেবে ১০ লাখ টাকা নগদে দেওয়ার জন্য বলেন। একটি কথোপকথনে তিনি উল্লেখ করেন, "আমি ওয়ান ক্রোরের (১ কোটি টাকা) কথা বলেছিলাম" এবং "যদি ১০ লাখের মতো অগ্রিম দেওয়া যায়, তাহলে খুব ভালো হয়—নগদে"।
ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা রয়েছে। পরিবারের দাবি অনুযায়ী, সাইমুম রেজা তালুকদার ২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রথম যোগাযোগ করেন এবং অর্থের বিনিময়ে জামিন নিশ্চিত করতে পারবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।
অভিযোগের প্রতিক্রিয়া ও পদক্ষেপ
এই অভিযোগের বিষয়টি জানার পর তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম সাইমুম রেজা তালুকদারকে ফজলে করিম চৌধুরীর মামলা থেকে সরিয়ে দেন, যদিও ট্রাইব্যুনালের অন্যান্য দায়িত্ব থেকে তাঁকে সরানো হয়নি। পরিবারের সদস্যরা নতুন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের কাছে রেকর্ডিং জমা দেন, যার পর সাইমুম রেজা তালুকদার দাবি করেন যে মন্ত্রী তাঁকে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়েছেন।
সাইমুম রেজা তালুকদার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "এটি সত্য নয়" এবং দাবি করেন যে কোনো একক প্রসিকিউটরের পক্ষে জামিন পাইয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছার সঙ্গে যুক্ত করেন।
রেকর্ডিং ও তদন্তের তথ্য
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা সাইমুম রেজা তালুকদারের সঙ্গে মোট ২৬ বার যোগাযোগ করেছেন এবং তিনি অন্তত ১৪ বার ঘুষ চেয়েছেন। রেকর্ড করা কথোপকথনগুলোতে তিনি টাকার অঙ্ক, কিস্তির ব্যবস্থা এবং ট্রাইব্যুনালের অভ্যন্তরীণ সভার তথ্য নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি ইঙ্গিত দেন যে তদন্তকারীরা প্রমাণ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন এবং ফজলে করিম চৌধুরীকে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার গঠনের পর ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটর পরিবর্তন হলে সাইমুম রেজা তালুকদার আবারও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জামিনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার প্রতিশ্রুতি দেন এবং টাকার বিষয়টি পুনরায় উত্থাপন করেন।
বিষয়টির আইনি ও রাজনৈতিক প্রভাব
এই ঘটনা আইসিটির স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার প্রক্রিয়ার ওপর প্রশ্ন তুলেছে। ফজলে করিম চৌধুরী চট্টগ্রাম-৬ আসনে আওয়ামী লীগের পাঁচবার সংসদ সদস্য ছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে এলাকায় দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁর অবস্থান এই ঘুষ কেলেঙ্কারির মাধ্যমে আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এই অভিযোগ সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান এবং সাইমুম রেজা তালুকদারের পদত্যাগকে শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি, যা ঘটনাটির গভীরতা নির্দেশ করে।



