এজলাসে ছবি তোলার অভিযোগে আটক, পরে জুলাই আন্দোলনের মামলায় কারাগারে ব্যবসায়ী সাগর
এজলাসে ছবি তোলার অভিযোগে আটক হওয়ার পর ফল ব্যবসায়ী সাগর দেওয়ানকে জুলাই আন্দোলনের একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সোমবার (৯ মার্চ) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাত তার জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে প্রেরণের আদেশ দেন। প্রসিকিউশন বিভাগের এএসআই গোলাম মহিউদ্দিন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
আটক ও গ্রেফতারের ঘটনাক্রম
সাগরের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন জানান, গতকাল রবিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার এজলাসে ছবি তোলার অভিযোগে তাকে আটক করা হয় এবং তার মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। সাধারণত মোবাইল জব্দ করলে ২-৩ ঘন্টা পর ছেড়ে দেওয়া হলেও, সাগরকে ছাড়া না দিয়ে জুলাই আন্দোলনের একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। তার জামিন আবেদন শুনানি শেষে আদালত আদেশ অপেক্ষমাণ রাখে এবং পরে নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
ফারজানা ইয়াসমিন আরও উল্লেখ করেন, সাগরের সঙ্গে তার বড় ভাই শাওনকেও আটক করা হয়েছিল, তবে পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এদিন আদালতে সাগরকে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা কোতয়ালী থানার এসআই জয়দেব শর্মা।
গ্রেফতারের স্থান ও অভিযোগের অস্পষ্টতা
আবেদনে সাগরকে কোথা থেকে আটক করা হয়েছে তা উল্লেখ না করায়, জয়দেব শর্মাকে জানতে চাওয়া হলে তিনি মোবাইলে বলেন, "তাকে বাদামতলী থেকে গ্রেফতার করা হয়।" তবে পরে আদালতে ঘটে যাওয়া তথ্য জানালে তিনি স্বীকার করেন যে সাগরকে ঢাকার সিএমএম আদালত থেকে আটকের পর জুলাই আন্দোলনের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
সাগরের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার সুনির্দিষ্ট কোনও অভিযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে জয়দেব শর্মা বলেন, "নো, কমেন্টস।" এই মন্তব্য অভিযোগের প্রকৃতি সম্পর্কে অস্পষ্টতা তৈরি করেছে।
এজলাসে ছবি তোলার ঘটনার বিস্তারিত
জুয়েল রানার আদালতের বেঞ্চ সহকারি আবু শাহিন গতকাল জানিয়েছিলেন, বিচারক দেখেন একজন এজলাসের ছবি তুলছে এবং ভিডিও করছে। বিচারক পুলিশকে মোবাইল জব্দের নির্দেশ দেন। এসময় তার সঙ্গে আরেকজন ব্যক্তিও ছিলেন। মোবাইল বিচারকের কাছে নিয়ে আসা হলে, বিচারক চেক করে দেখেন সাগর 'জেল-জুলুম লীগ' নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছবি পাঠিয়েছে। পরে তাকে পুলিশে সোপর্দ করে মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়।
গতকাল আদালত থেকে প্রিজনভ্যানে নেওয়ার পথে সাগর জানায়, তার এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করেছিল সে কোথায় আছে। পরে সে আদালতের ছবি তুলে বন্ধুকে পাঠিয়েছে এবং ভুল বশত এজলাসের ছবি তুলেছে বলে দাবি করে।
জুলাই আন্দোলনের মামলার পটভূমি
সাগরকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর এই মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, কবি নজরুল সরকারি কলেজের ২য় বর্ষের ছাত্র হাসিব সরকার জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। ১৬ জুলাই বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে পুরান ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সামনে স্টার হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের সামনে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং গুলি বর্ষণ করা হয়। একটি গুলি এসে লাগে হাসিবের বাম হাতে। এক ব্যক্তি তাকে উদ্ধার করে ইবনে সিনা হাসপাতালে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি প্রায় দুই মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন।
সুস্থ হয়ে ওঠার পর হাসিব আসামিদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে ২০২৪ সালের ১২ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫৬ জনের নামে মামলা দায়ের করেন। অপর আসামিদের মধ্যে রয়েছেন:
- ওবায়দুল কাদের
- আসাদুজ্জামান খান কামাল
- শাহাজান খান
- ড. হাসান মাহমুদ
- শেখ ফজলে নূর তাপস
- জুনাইদ আহমেদ পলক
- মোহাম্মদ এ আরাফাত
- আ.ফ. ম বাহাউদ্দিন নাছিম
এই ঘটনাটি আইন বিভাগের কার্যক্রম এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূত্রপাত করেছে, বিশেষ করে এজলাসে ছবি তোলার মতো অপেক্ষাকৃত ছোটখাটো অভিযোগ থেকে হত্যাচেষ্টার মতো গুরুতর মামলায় গ্রেফতারের প্রক্রিয়া নিয়ে।
