নরসিংদীতে কিশোরী হত্যা মামলায় চমক: সৎ বাবাই খুনি, অপহরণের গল্প ছিল মঞ্চায়ন
নরসিংদীতে কিশোরী হত্যা: সৎ বাবাই খুনি, অপহরণের গল্প ছিল মঞ্চায়ন

নরসিংদীতে কিশোরী হত্যা মামলায় চাঞ্চল্যকর মোড়: সৎ বাবাই আসল খুনি

নরসিংদীর সদর উপজেলায় এক কিশোরী হত্যার ঘটনায় পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। প্রথমে গণধর্ষণের বিচার দাবির জেরে অপহরণ ও হত্যা বলে ধারণা করা হলেও বাস্তবে সৎ বাবাই মেয়েকে হত্যা করে অপহরণের গল্প মঞ্চায়ন করেছেন। জেলা পুলিশ সুপার মো. আবদুল্লাহ আল ফারুক শনিবার দুপুরে তার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সৎ বাবার স্বীকারোক্তি ও হত্যার পেছনের কারণ

পুলিশ সুপার জানান, গ্রেপ্তারকৃত সৎ বাবা আশরাফ আলী আদালতে ধারা ১৬৪-এর অধীনে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, তিনি একাই মেয়েকে হত্যা করেছেন। মেয়ের আচরণে হতাশা এবং একাধিকবার সামাজিকভাবে অপমানিত হওয়ার কারণে তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটান। এরপর অন্যদের উপর দোষ চাপানোর উদ্দেশ্যে তিনি অপহরণের নাটক মঞ্চায়ন করেন।

১৫ বছর বয়সী ওই কিশোরীর লাশ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সদর উপজেলার মহিষাশুরা ইউনিয়নের বিলপাড় ও ডোরিকান্দির মধ্যবর্তী সরিষা ক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয়। তখন অভিযোগ উঠেছিল, মেয়েটিকে তার বাবার কাছ থেকে অপহরণ করে গণধর্ষণের বিচার দাবির জেরে হত্যা করা হয়েছে। সে রাতেই মাধবদী থানায় নয় জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করা হয়, যাতে এখন পর্যন্ত আট জন সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার হয়েছেন।

গণধর্ষণের অভিযোগ ও বিচার দাবির পটভূমি

পুলিশ সুপার আরও বলেন, মেয়েটির সাথে মামলার প্রধান আসামি নুর মোহাম্মদ (নুরা) নামে এক যুবকের সম্পর্ক ছিল। হত্যার প্রায় ১০-১২ দিন আগে আসামি হাজরত আলীর বাড়িতে মেয়েটিকে গণধর্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনায় মেয়েটি ও তার পরিবার বিএনপি নেতা ও সাবেক ইউপি সদস্য আহমেদ আলী দেওয়ানের কাছে বিচার চেয়েছিলেন। মামলা দায়েরের পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে নুর মোহাম্মদসহ আট জনকে আদালত আট দিনের রিমান্ডে দিয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে গণধর্ষণের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেলেও হত্যার সাথে তাদের সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পুলিশের হাতে আসেনি।

হত্যার বিস্তারিত বর্ণনা ও অপহরণের মঞ্চায়ন

শুক্রবার পুলিশ মেয়েটির সৎ বাবা আশরাফ আলীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তিনি হত্যার কথা স্বীকার করেন। তাকে পরে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে শনিবার আদালতে হাজির করা হয়, যেখানে তিনি ধারা ১৬৪-এর অধীনে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

পুলিশ সুপার আশরাফ আলীর জবানবন্দি উদ্ধৃত করে বলেন, ঘটনার রাতে তিনি পূর্বপরিকল্পিতভাবে মেয়েটিকে এক সহকর্মীর বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। নির্জন একটি সরিষা ক্ষেতের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি পেছন থেকে মেয়ের স্কার্ফ দিয়ে তার গলা চেপে ধরে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। এরপর লাশ ক্ষেতে ফেলে রেখে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন এবং পরে অপহরণের গল্প তৈরি করেন।

গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের তালিকা ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা

পুলিশ প্রধান জানান, এ পর্যন্ত মামলায় নয় জন সন্দেহভাজন গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে এক জনকে হত্যার অভিযোগে, চার জনকে ধর্ষণের অভিযোগে এবং পাঁচ জনকে অবৈধ সালিশে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তিনি যোগ করেন, সৎ বাবা আশরাফ আলী, নুর মোহাম্মদ (নুরা) এবং হাজরত আলী সবাই আদালতে তাদের ভূমিকা স্বীকার করেছেন।

গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের মধ্যে আশরাফ আলী (৪০) ছাড়াও রয়েছেন নুর মোহাম্মদ আলিয়াস নুরা (২৮), এবাদুল্লাহ (৪০), হাজরত আলী (৪০), মো. গাফফার (৩৭), আহমেদ আলী দেওয়ান (৬৫), ইমরান দেওয়ান (৩২), ইশাক আলিয়াস ইশা (৪০) এবং মো. আইয়ুব (৩০)। আরেক আসামি আবু তাহের এখনও পলাতক রয়েছেন।

গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আহমেদ আলী দেওয়ান স্থানীয় বিএনপির সম্প্রতি বহিষ্কৃত সহ-সভাপতি এবং মহিষাশুরা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য। এই ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সম্পৃক্ততাও তদন্তের আলোকে এসেছে।

পুলিশের এই তদন্তে হত্যার আসল রহস্য উন্মোচিত হওয়ায় সামাজিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সৎ বাবার এই নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং অপহরণের মঞ্চায়ন স্থানীয় সম্প্রদায়কে হতবাক করেছে। পুলিশ এখন বাকি পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে তৎপরতা চালাচ্ছে এবং মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া তদারকি করছে।