বরিশাল আদালতে হট্টগোলের ঘটনায় আইনজীবী সমিতির সভাপতি কারাগারে, চলছে আদালত বর্জন
বরিশাল আদালতে হট্টগোল: সভাপতি কারাগারে, আদালত বর্জন

বরিশাল আদালতে হট্টগোলের ঘটনায় আইনজীবী সমিতির সভাপতি কারাগারে

বরিশালে আদালতের এজলাসে ঢুকে হট্টগোল, বেঞ্চে ধাক্কাধাক্কি ও ভাঙচুরের ঘটনায় দ্রুত বিচার আইনে করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান (লিংকন) কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে বরিশাল আদালতে আইনজীবী সমিতির ডাকা আদালত বর্জন কর্মসূচি চলছে। আইনজীবীদের বিক্ষোভ ও আদালত বর্জনের কারণে বিচার প্রার্থীরা গুরুতর ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন, যারা মামলার তারিখ থাকায় আদালতে এসে আইনজীবীদের অনুপস্থিতি দেখে বিপাকে পড়েছেন।

ঘটনার পটভূমি ও আদালত বর্জনের কারণ

আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুসের জামিন দেয় অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পরদিন মঙ্গলবার আইনজীবী সমিতির সভাপতি লিংকন আদালত চলাকালে সেখানে প্রবেশ করে হট্টগোল করেন। তিনি এজলাস কক্ষে ঢুকে চিৎকার করতে করতে বেঞ্চগুলো ধাক্কা দেন এবং কাগজপত্র ছুড়তে থাকেন। বিচারকের সামনে গিয়ে তিনি আঙুল তুলে কথা বলেন এবং একটি বেঞ্চে আঘাত করেন।

এই ঘটনার জেরে বুধবার দ্রুত বিচার আইনে আইনজীবী সমিতির সভাপতিকে প্রধান আসামি করে ২০ জনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় মামলা করেন বেঞ্চ সহকারী। ওই মামলায় প্রধান আসামি সাদিকুর রহমান লিংকনকে গ্রেপ্তার করে এবং জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক। পরে সেদিনই এই ঘটনার প্রতিবাদে জেলা আইনজীবী সমিতি আদালত বর্জনের ঘোষণা দেন।

আদালত বর্জনের প্রভাব ও আইনজীবীদের অবস্থান

বরিশাল জেলা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর এইচ এম আনিচুর রহমান বলেন, জনভোগান্তি হোক এটা আইনজীবী সমিতি চায় না। তবে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারকের অন্যায়ের প্রতিবাদে বাধ্য আদালত বর্জনের মতো কর্মসূচি দিতে হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে এই কর্মসূচি চলমান থাকবে যতক্ষণ না ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।

এদিকে, আদালতে হট্টগোলের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ১ মিনিট ৪১ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরীয়তউল্লাহ একটি মামলার শুনানি করছিলেন। আদালতের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) ও আদালত পুলিশের তিন কনস্টেবলের উপস্থিতিতে শুনানি করছিলেন দুজন আইনজীবী। এর মধ্যে দরজা খুলে চিৎকার করতে করতে এজলাস কক্ষে ঢোকেন আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান। তার পেছনে ঢোকেন আরও কয়েকজন আইনজীবী, যারা এজলাসে বসার বেঞ্চগুলো হাত-পা দিয়ে ধাক্কা দিতে দিতে কাগজপত্র ছুড়তে থাকেন।

ভিডিও প্রমাণ ও সামাজিক মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া

ভিডিওতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, সাদিকুর রহমান বিচারকের সামনে গিয়ে চিৎকার করে আঙুল তুলে কথা বলছেন এবং বিচারকের উদ্দেশে কিছু বলতে থাকেন। তিনি বিচারকের সামনে থাকা একটি বেঞ্চে আঘাত করেন, যা আদালতের শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে ব্যাহত করে। পরে তারা এজলাস কক্ষ ত্যাগ করেন, কিন্তু এই ঘটনা আদালতের মর্যাদা ও আইনের শাসনের উপর গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

এই ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে এবং আইনজীবী সমিতির সদস্যদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেক আইনজীবী মনে করেন যে আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানো উচিত ছিল, কিন্তু হট্টগোলের মতো কর্মকাণ্ড আইনী পেশার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে। অন্যদিকে, কিছু আইনজীবী যুক্তি দেখান যে বিচারকের সিদ্ধান্ত অন্যায় হলে প্রতিবাদ করা তাদের অধিকার।

বর্তমানে, আদালত বর্জন কর্মসূচি চলমান থাকায় বিচার প্রার্থীরা তাদের মামলার শুনানি ও আইনী সহায়তা পেতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এই পরিস্থিতি নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধার করা যায় এবং জনগণের ভোগান্তি কমে।