বিমানের সাবেক এমডি সাফিকুর রহমান আদালতে জবানবন্দি দিতে অস্বীকার, শিশু গৃহকর্মী নির্যাতন মামলায় তদন্ত চলছে
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাফিকুর রহমান ১১ বছরের শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগে করা মামলায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে মামলার অপর আসামি গৃহকর্মী মোছা. সুফিয়া খাতুন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেছেন। আজ শুক্রবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীরের আদালতে এই জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে।
আদালতে হাজিরা ও জবানবন্দি প্রক্রিয়া
ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক তাহমিনা আক্তার জানান, আসামিদের ছয় দিনের রিমান্ড শেষে আজ আদালতে হাজির করা হয়। আসামিরা রাজি হওয়ায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক রোবেল মিয়া জবানবন্দি রেকর্ডের আবেদন করেন। কিন্তু বিচারকের খাসকামরায় গিয়ে সাফিকুর রহমান জবানবন্দি দিতে অস্বীকৃতি জানান। অপর আসামি সুফিয়া খাতুন জবানবন্দি দেন। পরে আদালত দুজনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
জবানবন্দি আবেদনে উল্লেখিত তথ্য
জবানবন্দি রেকর্ডের আবেদনে উল্লেখ করা হয়, পুলিশ রিমান্ডে আসামিদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তদন্তের স্বার্থে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়। মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কারাগারে রাখা জরুরি বলে মতামত দেওয়া হয়।
গ্রেপ্তার ও পূর্ববর্তী ঘটনা
এর আগে ২ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে আসামিদের গ্রেপ্তার করে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ। পরে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে সাফিকুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বীথিসহ চারজনকে কারাগারে পাঠানো হয়। অপর দুই আসামি হলেন ওই বাসার গৃহকর্মী রূপালী খাতুন ও মোছা. সুফিয়া বেগম। ১০ ফেব্রুয়ারি আদালত আসামিদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার রূপালী খাতুনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মামলার অভিযোগ ও শিশুটির অবস্থা
মামলার বাদী ওই গৃহকর্মীর বাবা একজন হোটেল কর্মচারী। তিনি অভিযোগ করেন, আসামি সাফিকুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী বীথির বাসার নিরাপত্তা প্রহরী জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে পরিচয় হয়। জাহাঙ্গীর জানতে পারেন, তাঁর একটি ছোট্ট মেয়ে রয়েছে এবং বাসায় বাচ্চা দেখাশোনার জন্য ছোট একটি মেয়ে বাচ্চা খোঁজা হচ্ছে। পরে তিনি ওই বাসায় গিয়ে সাফিকুর ও বীথির সঙ্গে দেখা করেন। তাঁরা জানান, যাকে রাখবে, তার বিয়েসহ যাবতীয় খরচ তাঁরা বহন করবেন। এতে রাজি হয়ে গত বছরের জুনে তিনি তাঁর ১১ বছর বয়সী মেয়েকে এই বাসায় কাজে দেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, সর্বশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর ওই বাসায় তিনি সন্তানকে সুস্থ অবস্থায় দেখে আসেন। তবে এরপর তিনি সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে গেলেও পরিবারটি নানা অজুহাতে দেখা করতে দেয়নি। গত ৩১ জানুয়ারি বেলা দেড়টার দিকে বীথি তাঁকে ফোন করে জানান, তাঁর মেয়েটি অসুস্থ এবং তাকে নিয়ে যেতে। তিনি বেলা দুইটার দিকে মেয়েকে আনতে যান। তখন বীথিকে ফোন করলে তিনি বাইরে আছেন জানিয়ে তাঁকে অপেক্ষা করতে বলেন। পরে বীথি সন্ধ্যা সাতটার দিকে বাড়ির বাইরে তাঁর কাছে মেয়েকে বুঝিয়ে দেন।
বাদী তখন দেখেন তাঁর মেয়ের দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম। মেয়েটি ভালোভাবে কথাও বলতে পারে না। কীভাবে এমন হলো, জানতে চাইলে বীথি সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে তিনি মেয়েকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। মেয়ে তাঁকে জানায়, ২ নভেম্বর তিনি দেখা করে যাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে অকারণে সাফিকুর রহমান, বীথিসহ অজ্ঞাতনামা আসামিরা তাকে মারধর ও খুন্তি গরম করে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছেঁকা দিয়ে গুরুতর জখম করেন।
এই ঘটনায় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং আদালতের পরবর্তী শুনানির জন্য আসামিদের কারাগারে রাখা হয়েছে। শিশু নির্যাতনের এই মামলাটি আইন ও আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার জড়িত থাকার অভিযোগে এটি আরও আলোচিত হচ্ছে।
