চকবাজার অগ্নিকাণ্ড মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা
ঢাকার পুরান এলাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় সাত বছর আগে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখনও বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে এই দুর্ঘটনায় ৭১ জন প্রাণ হারান এবং শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। নিহতদের মধ্যে অনেকের বাবা-মা, ভাই-বোন, ভাগ্নে-ভাগ্নি ও নিকটাত্মীয় রয়েছেন, যারা আজও বিচারের প্রতীক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন।
মামলার বর্তমান অবস্থা ও সাক্ষ্য গ্রহণের ধীরগতি
অগ্নিকাণ্ডের পরদিন নিহত জুম্মনের ছেলে আসিফ আহমেদ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আট জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। আসামিদের মধ্যে ভবনমালিক দুই সহোদর হাসান সুলতান ও সোহেল, রাসায়নিক গুদামের মালিক ইমতিয়াজ আহমেদ, পরিচালক মোজাম্মেল ইকবাল, ম্যানেজার মোজাফফর উদ্দিন, মোহাম্মদ জাওয়াদ আতিক, মো. নাবিল এবং মোহাম্মদ কাশিফ রয়েছেন, যারা সকলেই জামিনে মুক্ত।
২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জগঠন করে বিচার শুরু হয় ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ খোরশেদ আলমের আদালতে। তবে মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে আটকে আছে। সর্বশেষ গত ১২ নভেম্বর সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য থাকলেও কোনও সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। আগামি ২৯ মার্চ পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত মোট ১৬৭ সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ছয় জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে। সর্বশেষ সেলিম আহমেদ লিটন নামে এক সাক্ষী গত বছরের ৩১ জুলাই সাক্ষ্য দেন। এরপর দুইটি ধার্য দিনে রাষ্ট্রপক্ষ কোনও সাক্ষীকে আদালতে হাজির করতে ব্যর্থ হয়, ফলে সাক্ষ্য গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিচার প্রক্রিয়ায় চ্যালেঞ্জ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
মামলার প্রসিকিউটর মো. শহীদুল ইসলাম জানান, রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তৎপর রয়েছে। তিনি বলেন, "আমরা বিচারকের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করেছি। সাক্ষীদের সাক্ষ্য দিতে আদালত থেকে সমন পাঠানো হয়, কিন্তু তারা আদালতে আসেন না। তারা নিয়মিত হাজির হলে মামলার বিচার দ্রুত শেষ হতো। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো সাক্ষীদের হাজির করে সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন করার।"
বাদী আসিফ আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বছরে একবার সরকার এসে খোঁজ নিয়ে ছবি তুলে চলে যায়, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা বা কর্মসংস্থানের কোনও উদ্যোগ নেয় না। এখন পর্যন্ত বিচারই হয়নি, সাক্যগ্রহণ শেষ হয়নি। আমাদের মনে হয় না, বাংলাদেশে আমরা সুষ্ঠু বিচার পাবো। নতুন সরকারের কাছে একটাই চাওয়া, যেন তারা বিচারটা শেষ করে।"
আসামি হাসান সুলতান ও সোহেলের আইনজীবী মো. মোস্তফা পাঠান ফারুক দাবি করেন, "হাসান সুলতান ও সোহেল নিজেরা ভিকটিমাইজড। তাদের ভবন পুড়ে গেছে এবং আগুনে তাদের মা আহত হয়ে পরে মারা যান। ভবনটি রাজউক থেকে অনুমোদিত ছিল, তাই তারা দোকান ভাড়া দিয়েছিলেন। আমরা আশা করছি, ন্যায়বিচার পাবো।" তিনি আরও যোগ করেন, মামলার বিচার বিলম্ব হোক তা তারা চান না এবং আসামিরা নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন।
ঘটনার পটভূমি ও সামাজিক প্রভাব
২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিলিন্ডার ভর্তি ট্রাক থেকে বিস্ফোরণের পর হোটেলে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনায় আসিফ চকবাজার মডেল থানায় ভবনমালিকের দুই ছেলে সোহেল ও হাসানসহ অজ্ঞাত ১০-১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। আইনজীবী ফারুকের মতে, তখনকার সরকার এই মামলাকে বিশালভাবে উপস্থাপন করে জনগণের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
সাত বছর পরও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় স্বজন হারানো পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। তারা দ্রুত ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে আসছেন, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাব লক্ষণীয়। এই মামলার নিষ্পত্তি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার দক্ষতা ও গতিশীলতার একটি পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
