পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকে 'কল্যাণ' বললেন মন্ত্রী, বিশেষজ্ঞদের দ্বিমত
পরিবহন চাঁদাবাজিকে 'কল্যাণ' বললেন মন্ত্রী

পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকে 'কল্যাণ' হিসেবে দেখছেন মন্ত্রী

সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম পরিবহন খাতে মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে তোলা চাঁদাবাজিকে অনেকটাই বৈধতা দিয়েছেন। তিনি এটিকে 'সমঝোতার ভিত্তিতে তোলা টাকা' বলে অভিহিত করেছেন, যা জোর করে আদায় করা হয় না বলে তাঁর দাবি।

সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রীর বক্তব্য

গত বৃহস্পতিবার সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী রবিউল আলম বলেন, 'সড়কে পরিবহনের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি আছে, তারা তাদের কল্যাণে এটা ব্যয় করে।' তিনি আরও যোগ করেন যে এটি একটি অলিখিত বিধির মতো, যেখানে টাকা তোলা হয় সমঝোতার ভিত্তিতে, বাধ্য করার মাধ্যমে নয়।

নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী রবিউল আলমের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ ও মো. রাজিব আহসান। এ সময় রেল সম্প্রসারণ, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো, খাল পুনঃখনন ও সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞদের দ্বিমত ও গবেষণার ফল

পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞরা মন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন। তাঁদের মতে, পরিবহন খাতে নানা উপায়ে বছরে হাজার কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয়, যা এই খাতের বিশৃঙ্খলার মূল কারণ। পরিবহনবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, 'চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনা যাবে না।'

২০২৪ সালের মার্চে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। এই চাঁদার ভাগ পান:

  • দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী
  • ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ
  • বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কর্মকর্তা-কর্মচারী
  • মালিক-শ্রমিক সংগঠন
  • পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিরা

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের বৃহৎ বাস কোম্পানির প্রায় ৯২ শতাংশ পরিচালনার সঙ্গে রাজনীতিবিদেরা সম্পৃক্ত, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত।

চাঁদাবাজির ইতিহাস ও নীতিমালা প্রচেষ্টা

চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা নতুন নয়। ২০০২ সালে বিএনপি সরকারের সময় একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সমালোচনার মুখে তা বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করা হয়, যাতে বলা হয়েছিল:

  1. পরিবহন মালিক সমিতি সর্বোচ্চ ৪০ টাকা চাঁদা তুলতে পারবে
  2. শ্রমিক ইউনিয়ন সর্বোচ্চ ২০ টাকা চাঁদা তুলতে পারবে
  3. বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ১০ টাকা চাঁদা তুলতে পারবে

তবে সমালোচনার কারণে এই নীতিমালাও অনুমোদন পায়নি। বর্তমানে পরিবহন খাতে ৭০ টাকা চাঁদা তোলা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও নানা নামের চাঁদা।

সরকারের অগ্রাধিকার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী রবিউল আলম সরকারের অগ্রাধিকার সম্পর্কে বলেন, নতুন সরকার রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনাকে জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে কাজ শুরু করেছে। রেল সম্প্রসারণ, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খাল পুনঃখনন ও সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থাপনায় ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে ঢাকার প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণে আনা হবে এবং ভারত-বাংলাদেশ রেল যোগাযোগ পুনরায় চালুর বিষয়ে ১৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। আসন্ন ঈদে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে আগের সফল মডেল অনুসরণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, 'যেখানে জনস্বার্থ, সেখানে দলীয় স্বার্থ নগণ্য। কোনো সংগঠন বা গোষ্ঠীকে প্রাধান্য বিস্তার করতে দেওয়া হবে না।' তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে পরিবহন খাতে প্রকৃত শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে না।