ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার: ১৩০ আইন ও ৬০০ আদেশের ৮৪% বাস্তবায়ন
ইউনূস সরকারের ১৩০ আইন ও ৬০০ আদেশের ৮৪% বাস্তবায়ন

ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার: ১৩০ আইন ও ৬০০ আদেশের ৮৪% বাস্তবায়ন

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাত সোয়া নয়টায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) প্রচারিত বিদায়ী ভাষণে জানান, এই আইন ও আদেশগুলোর প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। ভাষণে তিনি সরকারের সংস্কার কর্মসূচির বিস্তারিত বিবরণ দেন, যা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও আইন পরিবর্তন

মুহাম্মদ ইউনূস তার ভাষণে উল্লেখ করেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় তরুণদের প্রত্যাশার কেন্দ্রে ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনে। তিনি বলেন, 'এই সংস্কারসমূহ নাগরিক অধিকারকে সংহত করেছে, বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে এবং গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি যেন আর কখনো ফিরে না আসে সেটা নিশ্চিত করেছে।' এই উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে সরকার একটি জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে চেয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় পরিস্থিতি ছিল ভঙ্গুর। অনেক থানায় পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি ছিল না, এবং জনমনে আস্থার বদলে ভয় কাজ করছিল। ধাপে ধাপে সে অবস্থা পরিবর্তন করা হয়েছে। তার দাবি, এখন পুলিশ মারণাস্ত্র ব্যবহার করে না, বেআইনিভাবে কাউকে তুলে নেওয়া বা 'বন্দুকযুদ্ধের' নামে হত্যার ঘটনা ঘটে না। জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী গড়ে তুলতে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদারে সরকারের পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • পৃথক সচিবালয় গঠন করা হয়েছে, যা বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করে।
  • বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে, যা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি রোধে সহায়ক।
  • দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনে সংস্কার আনা হয়েছে, যা বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুততর ও ন্যায়সঙ্গত করেছে।

সেপারেশন অব জুডিশিয়ারি কার্যকর করতে মাজদার হোসেন মামলার রায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এছাড়া, গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করা হয়েছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী বার্তা দেয়।

বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি

বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়াতে সরকার নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিয়েছে:

  1. রায় সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা জনগণের জন্য বিচারিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ সহজ করে।
  2. বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের বিধান যুক্ত করা হয়েছে, যা জটিল মামলাগুলোতে আন্তর্জাতিক দক্ষতা নিয়ে আসে।
  3. অন্তর্বর্তী আপিলের বিধান যুক্ত করা হয়েছে, যা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে এবং আইনি প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করে।

মানবাধিকার সুরক্ষায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করে কমিশন গঠন করা হয়েছে বলেও ভাষণে উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা। এই কমিশন মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত ও প্রতিকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখবে।

সর্বোপরি, মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের এই সংস্কারগুলো একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলোর বাস্তবায়ন বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি করেছে।