আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের দায়িত্বকালীন কাজের বিস্তারিত প্রকাশ
আসিফ নজরুলের আইন মন্ত্রণালয়ে কাজের বিস্তারিত

আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের দায়িত্বকালীন কাজের বিস্তারিত প্রকাশ

আইন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ে সম্পাদিত কাজগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করেছেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাত পৌনে ১২টার দিকে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্টের মাধ্যমে তিনি এই তথ্য তুলে ধরেন।

পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, ‘দেশের সেবা করার সুযোগ পেলে নাকি জান দিয়ে কাজ করবে? আসলে সে কিছুই করেনি। অপদার্থ একটা উপদেষ্টা। ইত্যাদি ইত্যাদি কতো কিছু শুনলাম এই দেড় বছরে। ভাই, আমি কিছু করিনি। করেছে আমাদের আইন মন্ত্রণালয়। তবে এর প্রতিটি কাজে আমি অংশীদার ছিলাম।’

তিনি আরও বলেন, ‘খুব সকালে অফিসে এসে প্রয়োজনে রাত ৮টা ৯টা পর্যন্ত থেকেছি, সামান্য বিশ্রাম নিয়ে গভীর রাতে বাসায় আবার কাজ করেছি। বহু শুক্রবার, শনিবার সচিবালয়ে অফিস করেছি। আমাদের এই টিমওয়ার্কে কোন ফাঁকি ছিল না।’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কার্যক্রম

আসিফ নজরুল তার পোস্টে উল্লেখ করেন যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। এই কার্যক্রমগুলোর মধ্যে প্রধান পাঁচটি বিভাগ রয়েছে:

  1. ২২টি আইনি সংস্কার: আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ, সুপ্রীম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রীম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ, মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, দেওয়ানি কার্যবিধিতে সংশোধন, ফৌজদারি আইনে সংস্কার, মামলা-পূর্ব বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতার বিধান সংযোজন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সংস্কার, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বিধিমালায় সংশোধনী, বিবাহ নিবন্ধন বিধিমালা সংশোধন, এবং অন্যান্য আইনে অধ্যাদেশ প্রণয়ন সহযোগিতা।
  2. ১৫টি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশন: জুডিশিয়াল সার্ভিসের স্বাধীনতা, তথ্য ও সেবা কেন্দ্র স্থাপন, কেন্দ্রীয়ভাবে আদালতের কর্মচারী নিয়োগ, দুর্নীতি প্রতিরোধ কার্যক্রম, প্রসিকিউশন মনিটরিং সেল, বিচার কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন, ই-ফ্যামিলি কোর্ট, অনলাইন বেইলবন্ড, আইন মন্ত্রণালয়ে ডিজিটালাইজেশন, জাতীয় আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা, দেওয়ানি আদালতের পরিচিতি, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত পৃথকীকরণ, রেকর্ড সংখ্যক নতুন আদালত সৃজন, এবং নিবন্ধন অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রেশন বিভাগের সংস্কার।
  3. ২৪,২৭৬টি হয়রানীমূলক মামলা প্রত্যাহার: রাজনৈতিক হয়রানীমূলক মামলা, সাইবার আইনের অধীনে স্পিচ অফেন্স সংক্রান্ত মামলা, এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে দায়ের করা প্রায় সকল মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
  4. গণহত্যার বিচার ব্যবস্থাপনা: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংগঠিত গণহত্যার বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক ও প্রসিকিউটরদের নিয়োগ, তাদের সকল লজিষ্টিক সহায়তা প্রদান, প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন ও প্রসিকিউশন কাজের তদারকির দায়িত্ব পালন।
  5. প্রায় তিনগুণ পরিমাণে দৈনন্দিন কার্যক্রম: গত দেড় বছরে মন্ত্রীপর্যায়ে নিষ্পত্তিকৃত নথির সংখ্যা ২২৮১টি, বিগত সরকারের একই সময়ে ১২৩৫টি নথি নিষ্পত্তি হয়েছিলো। এছাড়া ৫৭৮টি বিষয়ে আইনি মতামত প্রদান, রেকর্ড ১৫টি অংশীজন মতবিনিময় সভা আয়োজন, এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনগুলোর সাচিবিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

আইনি সংস্কারের উল্লেখযোগ্য দিক

আসিফ নজরুলের পোস্টে আইনি সংস্কারের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরা হয়েছে:

  • আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ: এই আইনটিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে, যাতে গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা, সাক্ষীর সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগ, অন্তর্বর্তীকালীন আপীল, এবং ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছে।
  • গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ: গুমের সংজ্ঞা নির্ধারণ, সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে তদন্ত ক্ষমতা প্রদান, ১২০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ভুক্তভোগীর পরিবারের সম্পত্তি ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে।
  • সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ: পূর্বের সাইবার নিরাপত্তা আইনের নিপীড়নমূলক ধারাগুলো এবং এসবের অধীনে দায়ের হওয়া মামলাগুলো বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অগ্রগতি

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলো:

  • জুডিশিয়াল সার্ভিসের স্বাধীনতা: বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালা, ২০২৫ প্রণয়ন করে পদসৃজনের ক্ষমতা সুপ্রীম কোর্টের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে, যা বিচারিক পদ সৃজনে বিলম্ব কমিয়েছে।
  • বিচার কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন: ৮০% আদালতে ই-কজলিস্ট নিয়মিত আপডেট করা হচ্ছে, এবং ই-ফ্যামিলি কোর্টের মাধ্যমে অনলাইনে মামলা দায়ের, হাজিরা ও শুনানি, কোর্ট ফি প্রদান করা যাচ্ছে।
  • নতুন আদালত সৃজন: রেকর্ডসংখ্যক ১৬০৫টি নতুন আদালত সৃষ্টি করা হয়েছে, এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত পৃথক করা হয়েছে।

হয়রানীমূলক মামলা প্রত্যাহারের প্রভাব

হয়রানীমূলক মামলা প্রত্যাহারের কার্যক্রমের মাধ্যমে ২৪,২৭৬টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে, যার ফলে কয়েক লক্ষ মানুষ সীমাহীন ভোগান্তি ও হয়রানী থেকে মুক্তি পেয়েছে। এই মামলাগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক হয়রানীমূলক মামলা, সাইবার আইনের অধীনে স্পিচ অফেন্স সংক্রান্ত মামলা, এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা অন্তর্ভুক্ত।

গণহত্যার বিচার সহায়তা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংগঠিত গণহত্যার বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক ও প্রসিকিউটরদের নিয়োগ, তাদের সকল লজিষ্টিক সহায়তা প্রদান, প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন ও প্রসিকিউশন কাজের তদারকির দায়িত্ব পালন করেছে আইন মন্ত্রণালয়। এই আদালতের চারটি মামলার রায় হয়েছে, আরও কমপক্ষে ছয়টি মামলার বিচার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, এবং গুম সহ বহু মামলার বিচার শুরু হয়েছে।

দৈনন্দিন কার্যক্রমের গতিশীলতা

দৈনন্দিন কার্যক্রমে লক্ষণীয় গতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মধ্যে মন্ত্রীপর্যায়ে নিষ্পত্তিকৃত নথির সংখ্যা বৃদ্ধি, আইনি মতামত প্রদানের হার বৃদ্ধি, এবং অংশীজন মতবিনিময় সভা আয়োজন অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া, বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড সংখ্যক আইন কর্মকর্তাকে (প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার) নিয়োগ করতে হয়েছে, এবং প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগে পাঁচজন বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগে ৪৮ জন বিচারপতি নিয়োগে সাচিবিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

আসিফ নজরুল তার পোস্টে সমালোচনার প্রতি সাড়া দিয়ে বলেন, ‘আমি জানি তারপরও সমালোচনা করতে কারো কারো ভালো লাগবে। সেটা করেন, সমস্যা নাই। তবে আমার একান্ত অনুরোধ তার আগে, কি কি কাজ করা হয়েছে তা একটু জেনে নিন।’