সালমান-আনিসুলের পরামর্শে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ: ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ক্ষমতাচ্যুত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলন দমনে কারফিউ জারি ও দেখামাত্র গুলির নির্দেশ প্রদানের ক্ষেত্রে এই দুই নেতার সরাসরি পরামর্শ ও ভূমিকা ছিল।
বিচার প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক সূচনা
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ট্রাইব্যুনাল-১-এ চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে এই মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ ও দাবি
শুনানি শেষে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, "বিগত সরকারের আমলে আসামি আনিসুল হক এবং সালমান এফ রহমান নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তারা পরস্পরের সঙ্গে একাধিক বৈঠক ও টেলিফোনে কথোপকথনের মাধ্যমে জুলাই-অগাস্টে ছাত্র-জনতাকে নির্মূল করার ষড়যন্ত্র করেছেন।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, "বারুদাস্ত্র, হেলিকপ্টার এবং সামরিক বাহিনী ব্যবহারের পরিকল্পনা তারাই করেছেন এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে প্রভাবিত করেছেন। এরই ফলশ্রুতিতে দেশজুড়ে পাখির মত গুলি করে ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়েছে।"
কারফিউ ও গুলির নির্দেশ প্রসঙ্গে তাজুল ইসলাম স্পষ্টভাবে বলেন, "আমরা দেখিয়েছি যে কারফিউ জারির ব্যাপারে সালমান এফ রহমান এবং আনিসুল হকের শলাপরামর্শ ছিল। তাদের পরামর্শেই দেখামাত্র গুলির নির্দেশ বা পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছে।"
অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ
প্রসিকিউশনের দাখিলকৃত অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে:
- জুলাই-অগাস্ট আন্দোলন দমনে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতেন সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক
- ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ফোনে আলোচনার মাধ্যমে তাদের ষড়যন্ত্র ত্বরান্বিত হয়
- ২৩ জুলাই মিরপুরে হত্যাকাণ্ড, ২৮ জুলাই মিরপুর-১০-এ মারণাস্ত্র ব্যবহার
- ৪ অগাস্ট মিরপুর-১-এ ১২ জন এবং ৫ অগাস্ট 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচি ঘিরে মিরপুর-২, ১০ ও ১৩ নম্বর এলাকায় ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনা
বিচার প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রম
এই মামলায় প্রসিকিউশন ২৮ জন সাক্ষীর তালিকা দাখিল করেছে। চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম দাবি করেছেন যে ডিজিটাল, ডকুমেন্টারি ও লাইভ এভিডেন্স এর মাধ্যমে আসামিদের অপরাধ অকাট্যভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হবে।
ট্রাইব্যুনাল আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণের জন্য তারিখ নির্ধারণ করেছে। গত ১২ জানুয়ারি সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
আসামিদের অবস্থান ও পটভূমি
২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর এই দুজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। একই দিন তাদের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল-১। আওয়ামী লীগের এই দুই প্রভাবশালী নেতা বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে আছেন। বিচার শুরুর দিন নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ট্রাইব্যুনালের কাছে ন্যায়বিচার চেয়েছিলেন আসামিরা।
প্রসিকিউশনের মতে, আনিসুল হক বিশেষভাবে "টু স্কুল অব থটস" এর কথা বলেছিলেন, যার একটি ছিল আন্দোলনকারীদের একেবারে নির্মূল করে দেওয়া। এই দুজনকে "গ্যাং অব ফোর" এর সদস্যও বলা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
