আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রধান অভিযুক্ত সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রধান অভিযুক্ত সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রধান অভিযুক্ত সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ প্রধান প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম মঙ্গলবার এক শুনানিতে দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেছেন যে, জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সময়কালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলো ছিল পূর্বপরিকল্পিত, সুসংগঠিত, লক্ষ্যভিত্তিক এবং ব্যাপক মাত্রায় পরিচালিত। বিচারক মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে তাজুল ইসলাম মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রসিকিউটর পক্ষের উদ্বোধনী বক্তব্য প্রদানকালে এসব কথা বলেন।

অভিযুক্তদের পরিচয় ও ভূমিকা

প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এই মামলার দুই প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক-এর নাম উল্লেখ করেন। তিনি সালমান এফ রহমানকে ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থানকারী একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন। অন্যদিকে, আনিসুল হক সম্পর্কে তিনি বলেন, আইনের শপথ নেওয়া সত্ত্বেও তিনি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে আইনি ও নীতিগত সমর্থন প্রদান করেছেন।

হত্যাকাণ্ডের পূর্বপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন

তদন্তের প্রমাণ সম্পর্কে তাজুল ইসলাম ব্যাখ্যা করেন যে, জুলাই আন্দোলন শুরুর থেকেই অভিযুক্তরা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ দমনের জন্য একটি নীলনকশা প্রণয়ন করে। সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে ধারাবাহিক বৈঠকের মাধ্যমে তারা বিক্ষোভকারীদের নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নেয়, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল:

  • প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশনা
  • দেখামাত্র গুলি চালানোর আদেশ
  • হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ
  • গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ব্যবস্থা

তিনি আরও বলেন, এই হত্যাকাণ্ডগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং রাষ্ট্রযন্ত্র, রাজনৈতিক দলের কর্মী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সমন্বয়ে গঠিত একটি অপরাধী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ নাগরিকদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করা।

ঘটনাবলীর বিস্তারিত বিবরণ

প্রসিকিউটর পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, রংপুরে আবু সাঈদের হত্যার পর অভিযুক্ত সালমান এফ রহমান প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করে পোস্টমর্টেম রিপোর্টে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ গোপন করতে এবং মিথ্যা তথ্য প্রদান করতে বাধ্য করেন। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই অভিযুক্ত জুটি কারফিউ জারি করে বিক্ষোভ সমাপ্ত করার একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গানভবনে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশে কারফিউ জারি করা হয় এবং সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়, যা হত্যাকাণ্ডের গতি ত্বরান্বিত করে।

হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা ২০ ও ২৮ জুলাই এবং ৪ ও ৫ আগস্ট পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এসব কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে মিরপুরে সিফাত হাওলাদার, আখতারুজ্জামান ও শাহরিয়ার আলভিসহ বেশ কয়েকজন তরুণ নিহত হন। শুধুমাত্র ২০ জুলাই অন্তত ২০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে প্রসিকিউটর পক্ষ দাবি করে।

প্রমাণ ও সাক্ষ্য উপস্থাপনা

এই মামলায় প্রসিকিউটর পক্ষ ২৮ জন সাক্ষী উপস্থাপনের পরিকল্পনা করেছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন:

  1. আহত শিকার
  2. প্রত্যক্ষদর্শী
  3. নিহতদের আত্মীয়স্বজন
  4. ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ
  5. তদন্তকারী কর্মকর্তা

এছাড়াও দলিলগত ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ, জব্দকৃত সামগ্রীর তালিকা, নমুনা, বিশেষজ্ঞ মতামত, বইপত্র এবং সুসংগঠিত অপরাধমূলক আচরণের প্রমাণও ট্রাইব্যুনালে পেশ করা হবে। তাজুল ইসলাম বলেন, শহীদদের আত্মা এই আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছে, আর আহতরা রাষ্ট্রীয় অপরাধের স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে

ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম ও সময়সূচি

ট্রাইব্যুনাল এই মামলায় সাক্ষ্য শুনানির জন্য ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তারিখ নির্ধারণ করেছে। এর আগে, গ্রেপ্তারকৃত দুই অভিযুক্তকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় এবং প্রসিকিউটর পক্ষ তাদের উপস্থিতিতেই উদ্বোধনী বক্তব্য পেশ করে। ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ গঠন করে বিচারকার্য শুরুর আদেশ দেয়। একই দিনে উদ্বোধনী বক্তব্য ও সাক্ষী জেরার তারিখ নির্ধারণ করা হয়, যেদিন অভিযুক্তরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ট্রাইব্যুনাল থেকে ন্যায়বিচার কামনা করেন।

প্রসিকিউটর পক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, সালমান ও আনিসুল জুলাই-আগস্টের বিক্ষোভ দমনের জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই তারা টেলিফোনে এই পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। তাদের অব্যাহত ষড়যন্ত্র ও উসকানির ফলে শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের মৃত্যু হলেও সহিংসতা বন্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রসিকিউটর পক্ষ আরও উল্লেখ করে যে, ২৩ জুলাই মিরপুরে হত্যাকাণ্ড, ২৮ জুলাই মিরপুর-১০ এ প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, ৪ আগস্ট মিরপুর-১ এ ১২ জনের মৃত্যু এবং ৫ আগস্ট মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে মিরপুর-২, ১০ ও ১৩ এ ১৬ জনের মৃত্যু তাদের পরিকল্পনা ও নির্দেশনার অংশ ছিল। ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১ আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযোগগুলো গ্রহণ করে এবং একই দিনে প্রসিকিউটর পক্ষ অভিযোগপত্র দাখিল করে।